Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

মা আমার মা


মা, তোমার মনে আছে আমায় কোলে বসিয়ে ঐ তারার দেশের গল্প শোনাতে?
একটি একটি তারা দেখিয়ে আমায় বলতে ঐ তারাটি আমার দাদী, ঐ তারাটি আমার মামা।
মা আমার মা
মনে আছে মা, চাঁদের ঐ টিপটি এনে পড়াতে আমার কপালে? আজ তুমি নেই আমার কাছে। বড় শূণ্য আমার সুখের ভূবন। বড় অসহায় মনে হয় নিজেকে। সবাই আছে, সব কিছু আছে, নেই শুধু মমতা মাখা আমার জগৎ জননী মায়ের হাসি ভরা মুখটা। জানো মা, কেউ আর আমাকে গল্প শোনায় না অচিন দেশের রাজকন্যার। কেউ আর বলেনা "আমার খোকনই পৃথিবীর সেরা রাজপুত্তুর"। কেউ কাছে ডেকে বলেনা "আমার খোকন সোনার মুখটি কেমন শুকিয়ে গেছে"। আচ্ছা 'মা, তুমিও কি ঐ তারার দেশে চলে গেছ, যেখান থেকে আর কেউ ফেরে না কোনদিন? কেউ দেখিয়ে দেয়না কোন তারাটি তুমি। মাগো, তুমি কি আকাশের উপর থেকে আমায় দেখ, আমার খবর রাখ? আমি সারাটি রাত ঐ আকাশ পানে তাকিয়ে থাকি তোমাকে দেখবো বলে, অপেক্ষায় থাকি কখন তুমি নেমে এসে হাত রাখবে আমার মাথায়। আজ তোমায় বড্ড বেশি মিস করছি মা। মনে পরে সেই স্মৃতিময় আদর মাখা দিনগুলোর কথা ; যখন আমার ঘরে ফিরতে একটু দেরী হলেই তোমার অস্থিরতা বেড়ে যেত, রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিয়ে পায়চারী করতে ঘর থেকে উঠোন, উঠোন থেকে রাস্তা। পাশের বাড়ির যে বিটলুর সাথে আমার ঝগড়া তার কাছেই তুমি ছুটে যেতে আমায় খুঁজে আনতে তোমার জন্যই মা, বিটলুর সাথে আমার ঝগড়াটা চিরস্থায়ী হলোনা। আজ বিটলু, আমার বন্ধু হয়েই আছে, শুধু তুমি নেই , নেই আর কেউ আমার জন্য রাত জেগে না খেয়ে অপেক্ষা করার। কেউ নেই তোমার দুষ্টু খোকার জন্য দুশ্চিন্তা করার মতো; বকাঝকা দেয়ার মতো। মাগো, জানো তুমি; এখন আর আমি অলসভাবে দেরী করে ঘুম থেকে উঠি না! তোমার শেখানো বিজয়ের গান গেয়ে জীবন সংগ্রামের দায়ভার নিয়ে কর্মের আহ্বানে আমিও সকাল না হতেই বিছানা ছেড়ে দৌড়োই ঘাম ঝরানোর জন্য ময়দানে। কিন্তু ঘুম জড়ানো চোখে তোমার মতো আর কারও কোলে মাথা রেখে আরেকটু ঘুমানোর বায়না ধরতে পারিনা। আজ তোমায় খুব মিস করি মা, খুব। তুমি কোথায় আছো বল না; আমিও আসবো সেখানে। রাখবো মাথা তোমার কোলে। তোমার আঁচলে মুখ ঢেকে ভুলে যাব গ্লানি ভরা জীবনের কষ্টের গানগুলো। তোমার মুখের স্মিত হাসিতে ভরাব আমার শূণ্য বুক। মাগো আমি আর তো সইতে পারিনা। সইতে পারিনা তোমাকে না দেখার কষ্ট। লক্ষ্মী মা, আমার তুমি কি এখনো আমার উপর রাগ করে আছো? বিশ্বাস করো, আমি আর দুষ্টুমি করবো না। মা, মাগো একবার এসো আমার কাছে। তোমার খোকন আর তোমাকে জ্বালাতন করবে না। শুধু তোমার বুকে মাথা গুঁজে হাজার ক্লান্তি ভুলে দেব এক লম্বা শান্তির ঘুম।
মা, মাগো আমার,
আমার সোনা মা,
একবার কোলে তুলে নাও
তোমার অলস দুষ্টু রাজপুত্তুরকে ।


লেখক
- শ্রী চন্ডীদাশ আচার্য্য
---------৩০.০৪.২০১৫-----------------

Mobile -01818-022367

রাতের অপূর্ণ গল্প


 খাঁ খাঁ রোদে বেজায় দুপুর !

খরাত্তাপ ছড়িয়ে সূর্যের অহংকার একরকম মর্ত্যে এসেই ঠিকড়ে পড়লো ।

আজকাল বেশ গরম পড়েছে ।

গোস্বা সূর্যকে ঠেলে আকাশে যদি মেঘের আনাগোনা দেখা যেতো! শীতল বাতাসে যদি নিথর গাছের পাতায় ঝড় উঠতো!
বেশ ভালোই হতো ।
রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে রাতুল ।
তবু সাইকেলে প্যাডেল মেরেই চলেছে ।
কপাল বেয়ে দরদর ঘাম ঝড়ছে । রং চটকানো শার্টের পেছনটা ভিজে গেছে । ভেতরে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা হয়নি ।
পুরনো জিন্সপ্যান্টটার ভাঁজে ভাঁজে বেশ ময়লাটে দেখাচ্ছে ।

পাকারাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছে । তবু যেনো চাকা ঘুরেনা । মনে হয় উল্টা ঘুরছে । রাতুল যতোই প্যাডেল দিচ্ছে, ততোই যেনো থেমে যেতে চাইছে সাইকেলের চাকা ।
আচ্ছা এমন হচ্ছে কেনো?
এমন দিনে আসলে এমনই হয় ।
সময় হঠাৎ করে দীর্ঘ হয়ে যায় । রবিবার যেনো ফিরে যায় অতীতের শনিবারে । বিকেল ফিরে যায় সকালে । কিন্তু এইচ,এস, সি পরীক্ষার আগে সময়ের তো এমন উদারতা দেখিনি! আর কয়েকটা মাস হাতে পেলেই পরীক্ষাটা ভালো দেয়া যেতো ।
ভালো পরীক্ষা দিয়েই বা কী হবে!
আমার মতো বর্গাচাষীর ছেলের কি আর ওদের মতো মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিং-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সামর্থ্য আছে?

কিছুদিন আগেই, সব তত্ত্বীয় পরীক্ষার শেষে ব্যবহারিক পরীক্ষা চলার সময় বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলো, "বাজান, এইবার তো তুই ইন্টার পাস করবি । অহন পড়ালেখা ছাইরা চাকরি টাকরি কর ।"

বাবার মুখে কথাটা শুনে রাতুলের খুব খারাপ লেগেছিলো । কোথায় তার সহপাঠিরা ভার্সিটি-মেডিকেল কোচিং করতে ভর্তি হচ্ছে, আর তার বাবা কিনা বলছে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে !

সারাটা দিন রাতুল বাইরে বাইরে ঘুরে কাটিয়ে দিয়েছে । মনের ভিতর একটাই প্রশ্ন, আমরা কেনো এতো গরীব?
সন্ধ্যেবেলায় ঘরে ফিরে চারটে ভাত খেয়ে ঘুমাতে গেলো । ঘুম আসছেনা । জানালার খুপড়ি দিয়ে চাঁদটাকে দেখছে আর ভাবছে । ভাবনাগুলো চোখের মণি থেকে নির্গমিত হয়ে তিলা পড়া বালিশ ভিজাচ্ছে ।
চোখের জল যখন শুকিয়ে গেলো, বুকের ভেতরটায় বিশাল জায়গা খুঁজে পেলো । এ জায়গা ত্যাগের, সহমর্মিতার !
আমার বাবাতো কম কষ্ট করেনি আমার জন্য । যখন যা চেয়েছি, সাধ্যে না থাকলেও ঋণ করে হলেও দিয়েছে । বাবাও আর ভাঙ্গা শরীর নিয়ে কাজ করতে পারছেনা । আমরা গরীব । গরীবদের অত বড় বড় স্বপ্ন দেখাও পাপ । এ যে অন্যায়, এ যে বাবার প্রতি জুলুম ।

পরদিন সকালে উঠে রাতুল তার বাবাকে বলল যে, সে গাজীপুরে যাবে । সে গার্মেন্টসের চাকরি করবে । খুশির খবর হলেও বাবার মুখটা কেমন জানি কাঁদো কাঁদো ভাব! তারসাথে তীব্রহতাশা ফুটে উঠেছে । আক্ষেপের জলছাপটাও রাতুলের চোখে ভেসে উঠেছে । তবে রাতুলের চোখে খুব একটা জল আসলোনা । কারণ, রাতে তো কম কাঁদেনি ।

শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো আর দুটো মাস থেকে তারপর যাবে রাতুল ।

এরমাঝখানের দিনগুলোতে রাতুলের ছন্নছাড়া ভাবে কেটে গেলো ।

বাজার থেকে নতুন শার্ট, প্যান্ট আর একজোড়া জুতা কিনে দিয়েছে রাতুলের বাবা ।
ট্রাংকে তুলে রেখেছে । যাবার দিন পড়ে যাবে ।

তাই আজকে রাতুল রং চটকানো শার্টটা পরেই শহরে যাচ্ছে । রেজাল্ট দেয়ার কথা ।

সাইকেলের প্যাডেল চালাতে চালাতে যতই শহরের কাছাকাছি আসছে, রাতুলের বুকটা ততই দুরুদুরু কাঁপছে ।

অবশেষে শহরের একটা কম্পিউটারের দোকানে এসে থামলো । অনেক ভিড় । চেনা কয়েকটা সহপাঠির দেখা মিললো । তারাও রেজাল্ট দেখতে এসেছে ।

সবার দেখা শেষ । এবার রাতুলের দেখার পালা । কিন্তু ইন্টারনেটে প্রবলেম । তাই টেলিটক সিমে দেখতে হচ্ছে । শুধু রেজাল্ট আসছে , সব সাবজেক্টের রেজাল্ট আসছেনা । তবু রোল নাম্বার দিলো রাতুল, তবে ভয়ে ভয়ে । রোল নাম্বারটা বলেই বাইরে চলে এলো । বেশ ভয় আর অস্থির লাগছে ।
-রাতুল কে?
-জি ভাই, আমি ।
-আপনি জিপিএ ৫ পেয়েছেন !
রাতুলের কান শো শো করছে ।
চোখ ঝাঁপসা দেখছে । কারণ সে প্রাইভেট পড়তে পারেনি অর্থের অভাবে । তারপরেও. . . .?

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, এসএমএস স্বচক্ষে দেখলো সত্যিই সে A+ পেয়েছে । দোকানের ভাইটাকে টাকা দিয়ে সাইকেলে চেপে বসলো । তার সহপাঠীরা সোৎসাহে বলল, দোস্ত, তুইতো A+ পাইছিস! মিষ্টি খাওয়া !

রাতুলের কাছে ততটাকা নেই । তাই বললো, আরেকদিন খাওয়াবো ।

সাইকেল ঘুরিয়ে ফের রওনা হলো গ্রামে ।

রাতুলের বাড়ি ফিরার পথে তার চিন্তাকথা পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই না । কারণ বাড়ি ফিরার পথে সে তার নিজস্ব জগতের অনেক কিছু ভেবেছে । গোপন করে রেখেছে অশ্রুর আড়ালে । তবে একটা কথা বলে রাখি, বাড়ি ফিরে সে তার বাবাকে বলেছিলো-

বাবা, আমি ইন্টার পাস করেছি । জিপিএ- ৩.৫০ পেয়েছি ।

সেদিন রাতেই সে গাজীপুরের টিকেট কাটে । ঠাকুরগাঁও টু গাজীপুর । অনেক দূরের পথ ।
একেএকে সবাইকে বিদায় জানিয়ে কোচে উঠল রাতুল । গাজীপুরে তার দুলাভাইয়ের ওখানে
উঠবে সে ।

দশটার দিকে গাড়ি ছাড়লো । এই প্রথম রাতুল বাবা মা ছেড়ে দূরে যাচ্ছে । চেনাশহরটাও আজ গাড়ির ভিতর অচেনা লাগছে । গাড়ি চলছে ।
। তারপাশে একটা ভদ্রলোক । মনে হয়, ব্যবসার উদ্দেশ্যে ঢাকা যাবেন । রাতুল জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছে । মুখটা অনেক বিমর্ষ ।

সে তার বাবাকে মিথ্যে বলেছে । কারণ ভালো রেজাল্টের কথা শুনলে হয়তো যেতে দিতোনা ।
কিন্তু রাতুলকে তো যেতেই হবে ।

টুত টুত করে রাতুলের পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠলো । এসএমএস এলো ১৬২২২ থেকে ।
আসবেই তো । সেই
দুপুর থেকে কম এসএমএস
পাঠিয়েছে সে । কিন্তু একটা রেজাল্টো আসেনি ।
ইনবক্স খুলে রাতুল দেখলো তার রেজাল্ট এসেছে । মেসেজের নিচে এসে তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো ।

একি! সে প্রত্যেক বিষয়েই A+ পেয়েছে ! তারমানে গোল্ডেন A+?

দুইমিনিট ধরে এসএমএসটা দেখার পর কী মনে করে যেনো ডিলিট করে দিলো ।

ফের বাইরে চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আছে রাতুল ।
কী ভাবছে সে?
অপূর্ণ রাতের গল্প?
হয়তো ।

লেখক
- ইলিয়াস আহমেদ