Showing posts with label চিন্তা ভাবনা. Show all posts
Showing posts with label চিন্তা ভাবনা. Show all posts

মুক্তচিন্তার আবরণে মানসিক দাসত্বের জয়ধ্বনি


মুক্তচিন্তার আবরণে মানসিক দাসত্বের জয়ধ্বনি

- মোহাম্মদ আসাদ আলী

মুক্তচিন্তার আবরণে মানসিক দাসত্বের জয়ধ্বনি
কিছুদিন আগেও মানুষের শরীর কেনা-বেচা হতো। গবাদি পশুর মতো জীবন্ত মানুষকে নিয়ে চলত দরকষাকষি। শক্ত-সামর্থ পুরুষ ও রূপবতী নারীর দাম ছিল সর্বোচ্চ; অন্যদিকে শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা বিক্রী হতো খুবই অল্প মূল্যে। গরু-মহিষ দিয়ে যেভাবে জমিতে হালচাষ করা হয়, পণ্য পরিবহন করানো হয় এদেরকে দিয়ে তার চেয়েও কষ্টসাধ্য কাজ করানো হতো বিনা প্রশ্নে, বিনা শর্তে। এক আদম সন্তানের শরীর নিয়ন্ত্রণ করতো আরেক আদম সন্তান। কিন্তু সেদিন কি আর আছে? আজ যুগের হাওয়া বদলেছে। মানুষের যান্ত্রিক সফলতা আকাশ ছুঁয়েছে। উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরুর রহস্য, তারকারাজি, সূর্য-চন্দ্রের অবস্থান, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও কার্যপ্রণালী, আসমান-জমিনের স্তরবিন্যাস, সমুদ্রের তলদেশের বৃহদাকার প্রাণী, কিংবা সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্মতম কীট-কীটানুকের, জীব-অনুজীবের, উদ্ভিদরাজির প্রতিটি কোষ থেকে অণু পরমাণু- সব আজ মানুষের নখদর্পনে; মানুষের নিয়ন্ত্রণে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক পদচারণায় মেতে উঠেছে বিশ্বজগৎ। গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ির জায়গা দখল করেছে বাস, ট্রাক, টেম্পু, রেল। কর্দমাক্ত বা ধূলি-ধূসরিত বন্ধুর রাস্তার দখল নিয়েছে পিচঢালা রাজপথ। কুপের দখল নিয়েছে পাম্প। অন্ধকার খুপড়ি রূপ নিয়েছে বিশাল বিশাল সুরম্য অট্টালিকায়। পত্রবাহী দূতের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন, টিভি, ইন্টারনেট। আর এভাবেই যুগের পরশে বদলেছে দাসত্বের ধরনও। যুগের চাহিদা অনুসারে শারীরিক দাসত্ব পর্যবসিত হয়েছে মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বে, যার শিকার পৃথিবীর সাতশ’ কোটি মানুষ।
মুক্তচিন্তার প্রধান ঘাতক: গণমাধ্যম ও শিক্ষাব্যবস্থা
আগের দিনে দাসদের অন্তত এটুকু বোঝার সামর্থ্য ছিল সে আর দশটা মানুষের মতো স্বাভাবিক নয়, সে দাস, মুক্ত হাওয়ায় মুক্ত মানুষের জীবন উপভোগ করতে সে ব্যর্থ। এ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু বর্তমানের যে সাতশ’ কোটি মানসিক দাসের কথা বলা হচ্ছে তাদের দ্বৈন্যদশা এতই করুণ যে, তারা বুঝতেও পারছে না তারা পরাধীন, দিবারাত্রি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, মিথ্যা হাওয়ায় ফুলিয়ে রাখা হয়েছে তাদের স্বাধীনতার বেলুন। বস্তুত স্বাধীন কর্মের সুযোগ যা একটু আছে, স্বাধীন চিন্তার সুযোগ তাদের একেবারেই নেই। মানবজাতির চিন্তা-চেতনায় পরোক্ষ সীমারেখা টেনে দিয়েছে পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতাপ্রসূত সিস্টেম। মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করার এ নিদর্শন ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
মানুষ তার চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান, বুদ্ধি খাটিয়ে যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজ করতে পারে। তবে সে জন্য মুক্তবুদ্ধি বা মুক্তচিন্তা অতি প্রয়োজনীয়। কারণ মানুষের সিদ্ধান্ত রচিত হয় চিন্তা থেকে। আবার মুক্তচিন্তার জন্য প্রয়োজন মুক্ততথ্য, এ কথা সকলেই স্বীকার করবেন। সে তথ্যে কারও হস্তক্ষেপ থাকা যাবে না, কারও স্বার্থ জড়িত থাকা যাবে না। কারণ জ্ঞানের সাথে স্বার্থের মিশ্রণ ঘটা মানেই ওই জ্ঞান বিষাক্ত হয়ে যাওয়া। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো- প্রচলিত সিস্টেমে জনসাধারণ যে দু’টি মাধ্যম থেকে সরাসরি তথ্য পায় অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যম, এগুলোর সাথে শুধু স্বার্থের মিশ্রণ আছে তাই নয়, পুরোটাই স্বার্থের উপরে প্রতিষ্ঠিত। মানুষকে সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য প্রদান করে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার বদলে এই মাধ্যমগুলো প্রয়াস চালায় জনসাধারণকে প্রভাবিত করে স্বীয় সিদ্ধান্ত সকলের উপর চাপিয়ে দিতে। এর কারণ নির্ণয় করা খুব সহজ। শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যম উভয়ই নিয়ন্ত্রণ করে শাসকগোষ্ঠী এবং কর্পোরেট ব্যবসায়ী শ্রেণি। কাজেই রাষ্ট্রে শাসকের অপকর্ম ফাঁস হতে পারে বা শাসকের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো তথ্য বা শিক্ষা এ মাধ্যম থেকে আশা করা যায় না। অন্যদিকে পুঁজিবাদী বিশ্বের সরকারগুলো সাধারণত নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজিপতি-শিল্পপতিরা। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড, থার্ড ওয়ার্ল্ড দিয়ে কথা নয়, সকল দেশেরই রাজনীতি ও সরকার পুঁজিপতি বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। বর্তমান পৃথিবীর সুপার পাওয়ার খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারও নিয়ন্ত্রিত হয় সে দেশের বিলিয়নারদের দ্বারা। এরাই আবার মিডিয়ারও মালিক। কাজেই পুঁজিপতি অনুগত সরকারের নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা ও পুঁজিবাদের হাতের পুতুল মিডিয়া সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে স্বার্থকে আগ্রাধিকার দেবে- সেটাই তো স্বাভাবিক। সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, সেই গণমাধ্যমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ মানসিকভাবে পুঁজিবাদের দাসত্ব করবে সেটাও খুব অস্বাভাবিক নয়। এখন দেখা যাক শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে মুক্তচিন্তার বিকাশ রুদ্ধ করে সাধারণ মানুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দাসত্বে পর্যবসিত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা কী কী কর্মপন্থা গ্রহণ করেছে।
অর্থনীতিক উন্নয়নের মরিচিকা ও রাজনীতিক সিস্টেমের জাল
প্রথমত, মানবজীবনের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নতিকেই মানুষের সার্বিক উন্নয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারাটা সাম্রাজ্যবাদ ও স্বার্থবাদের বড় কৃতিত্ব। কারণ মানুষ যতই অর্থের পেছনে ছুটবে, রুজি-রোজগার নিয়ে পড়ে থাকবে, অর্থনৈতিক উন্নতি নামক মরিচিকার ভ্রমে ডুবে থাকবে ততই সে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক প্রাণীবিশেষে পরিণত হবে। সমাজ, দেশ ও জাতি নিয়ে তার কোনো ভাবনা থাকবে না। পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদীরা যে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে তার প্রাথমিক ফল হলো সম্পদের ভারসাম্যহীনতা, সহস্র জন ক্ষুধার্ত মানুষের বিপরীতে একজন মিলিয়নার। একজন মিলিয়নারের চাহিদা পূরণে প্রাণপণে শ্রমব্যয় করতে হচ্ছে এক সহস্রকে। ভাগ্যচক্রে এক বেলা উপার্জন ব্যাহত হলে আরেকবেলা উপোস করা যাদের অবধারিত, তারা অর্থনীতিক উন্নতিকেই জীবনের লক্ষ্য জ্ঞান করবে না তো কী করবে? ফলে অর্থনীতিক উন্নতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে জীবনের অপরাপর বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় ও সুযোগ কোনোটাই তাদের নেই। এসব নিয়ে ভাবছে কেবল ওই মিলিয়নার এবং বিলিয়নাররা যারা ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের মনিবের আসনে আসীন। এদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া সাধারণ মানুষকে যা ভাবাতে চায় মানুষ তা-ই ভাবে, যা বিশ্বাস করাতে চায় মানুষ তা-ই বিশ্বাস করে।
দ্বিতীয়ত, অথর্নীতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী শোষক শ্রেণির পাতানো শৃঙ্খল ভেঙ্গে যদি কিছু মানুষ বের হয়েও পড়ে এবং অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, সেই সোচ্চার হবার পথেও ফাঁদ পেতে রেখেছে সাম্রাজ্যবাদীরা। র‌্যালি, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, অনশন, প্রতিকী অনশন, মিছিল, মৌন মিছিল, ঘেরাও, স্বারকলিপি প্রদান ইত্যাদি হাজারো চিত্তাকর্ষক প্রতিবাদের প্রক্রিয়া তৈরি করে রাখা হয়েছে। এটা করা হয়েছে যেন মানুষের ক্ষোভ উথলে না পড়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সুযোগ পেয়ে রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে, আখেরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত না হয়, শোষক-নিপীড়ক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষিত হয়।
বিষাক্ত ফল প্রদায়ক বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা কেটে লাভ নেই, বিষফল থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন সমুলে উৎপাটন, এ কথা কে না জানে? একইভাবে যে সিস্টেম এত অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম দিচ্ছে তাকে টিকিয়ে রেখে শুধু গুটিকয় অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সমীচীন নয়, প্রয়োজন পুরো সিস্টেমের পরিবর্তন। কিন্তু এ সত্য বোঝার মতো মানসিক অবস্থা কয়জনের আছে?
রেলগাড়ি উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম যে দিকেই যাক রেললাইনের উপর দিয়েই যেতে হয়, লাইনের বাইরে গিয়ে চলতে পারে না। একইভাবে আপনি যতই স্বাধীনতার কথা বলুন, মুক্তির কথা বলুন, মুক্তচিন্তা বা মুক্তমনের ধুয়া তুলুন, সেসব কথার কথা। বাস্তবে আপনার জীবন নামক রেলগাড়িটি চালিত হচ্ছে সিস্টেম নামক রেললাইনের নির্দিষ্ট রাস্তা ধরে, নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আসলে আপনি কিছুই করছেন না, আপনাকে দিয়ে করানো হচ্ছে। আপনার মস্তিষ্ক, আপনার চিন্তা-ভাবনা, আপনার সিদ্ধান্ত- সবই সাম্রাজ্যবাদের কষা ছকের অন্তর্ভূক্ত। আপনি বাস্তবায়ন করছেন মাত্র।

সোর্স: (https://www.amarblog.com/asadali/posts/185604#sq-new)

হচ্ছে হোক, হতে দাও দূর হোক এই মনোভাব.


হচ্ছে হোক হতে দাও, দূর হোক এই মনোভাব
যে জাতি জলজ্যান্ত অন্যায়কে অস্বীকার করতে শিখে গেছে সেই জাতি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে কী করে? আর রাষ্ট্র পরিচালনা? শিক্ষার্জনের জন্য শিয়ালের কাছে কুমির ছানা দেয়ার মতো । তাইতো দেখে আসছে সবাই । সবার চোখে তা দৃশ্যমান হলে কী হবে? বোধোদয় সেই চায়ের কাঁপে ফুঁক অথবা ফেসবুকে তোলপাড়, বড়োজোর কয়েকটা প্ল্যাকার্ড-ব্যানার নিয়ে টিএসসির সামনে আন্দোলন পর্যন্ত । যদিও আন্দোলনকারীদের তুলনায় মিডিয়ার ক্যামেরার সংখ্যাটাই বেশি । কেনোনা এটা ব্রিটিশদের কর্তৃক পরীক্ষিত, জাতিগতভাবে আমরা এতোটাই নিমকহারাম আর বুর্জোয়া প্রকৃতির যে নিজের আখের গোছানোর জন্য সমগ্র স্বাধীন বাংলাকে একরকম জোর করেই ব্রিটিশদের বিলেতি পকেটে ঢুকিয়ে দিকে কুন্ঠাবোধ করিনা । আর সে কারণেই আজকের এই আধুনিকোত্তর যুগে গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারীদের কাছে সাধারণ মানবসেবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের দলীয় স্লোগান বা ব্যানার মিডিয়ার বদৌলতে জনসম্মুখে প্রদর্শণ করার । আমরা আজ কতটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছি সেই চিন্তায় হয়তো একাত্তর কিংবা বায়ান্নের শহীদেরা হতভম্ব ।

ভাবার কোনো ফুরসুরতই নেই, আজ যে নারীটির ক্ষতি হয়েছে সেই নারীটিই আমার মা, আমার বোন, আমার স্ত্রী; আজ যে ভাইটি গুম, খুনের শিকার, সেই ভাইটিই আমার বাবা, আমার ভাই । নির্বোধ জাতিটির কানে ঢুকিয়ে দিলেও পরের দিন স্কুল-কলেজগামী ছাত্রী কিংবা শিক্ষিকার সাথে এমন আচরণ করবে, সেই কথা অবলা নারী কারো কাছে প্রকাশ করতে পারেনা, অভিযোগ? সে তো বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর অপেক্ষায় কাঠখড় পোড়ানোর বিষয় ।

মানুষকে মেরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবেন ভালো কথা । আগে নিজেকে, নিজের মা-বাবা-ভাই-বোন আত্মীয়স্বজনকে পুড়িয়ে মেরে তা মিডিয়াতে প্রকাশ করেন । এতে করে আপনার ও আপনার পরিবারের আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে । হয়তো এই কোরবানি নবী ইবরাহিম আঃ ও ইসমাঈল সাঃ এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে । অন্যকে মেরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার সার্থকতা নেই, তা গৌরবের বিষয়ও না । আমার কথা শুনে রাগ উঠলেও কিছু করার নেই ।

বুদ্ধিজীবি নামক দেশের অভিভাবকদের চালচলন আর কথাবার্তা দেখলে মনে হয় তাদেরকে ভাড়া করে আনায় হয়েছে হুহু করে কান্না করার জন্য, আলগা চেতনা দেখার জন্য, পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতাগুলো দখল করার জন্য । এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী লোকগুলো লেবাসধারী ধূর্তবাজ ধর্মীয় নেতার চাইতে কম নয় । গায়ে দামি খদ্দের একটা চাঁদর, পাঞ্জাবী, সজারুর কাঁটার মতো গোঁফ, সাদা ঝাঁকড়া চুল আর নামের আগে পিছে কয়েকটা টাইটেল নিয়ে চেতনার পসরা নিয়ে বসে আছে । সাদ্দুসাই-ফরিশি-মাওলানা-পুরোহিতরা যেমন পুঁজি হিসেবে ধর্মের কেত্তন গেয়ে বেড়ায়, তেমনি এই ধূর্তবাজ বুদ্ধিজীবিগুলো শান্তির ফেরিওয়ালা হয়ে গণতন্ত্র ও চেতনার হরেক রকম পসরা বিক্রি করে বিশ্বস্ত ও অবিশ্বস্ত ক্রেতার নিকট । ফলে কী হচ্ছে? প্রজন্মের একটা অংশের কাছে সায়েন্স ফিকশন বই হাত ধরিয়ে দিয়ে লাভের যা হচ্ছে তা হলো-দেশের সন্তান বিদেশে গিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিজ্ঞানী যা হওয়ার হচ্ছে-দেশে ফিরে মানবসেবা করছে কয়জন? প্রজন্মের আরেকটা অংশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমগ্র গিলিয়ে দিয়েও লাভের যা হচ্ছে তা হলো-মারামারি, হানাহানি আর দলীয় বিদ্বেষে ভরপুর রাজনীতি-ঐক্যবদ্ধ বাঙ্গালি গড়ার পরিবর্তে জাতীয় বিভাজনে রূপ নিয়েছে বাংলাদেশ । বলছিনা সায়েন্স ফিকশন বই পড়া বা মুক্তিযুদ্ধ চেতনাবুলি বুকে ধারণ করা খারাপ, বরং যথেষ্ট ভালো এবং রাষ্ট্রীয় কল্যাণের অন্যতম প্রগতিশীল দিক । কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে । এক বুদ্ধিজীবি শ্রেণি, এক শিক্ষকসমাজ একটা প্রজন্মকে এটা বোঝায় যে, বিজ্ঞানই জীবন কিংবা প্রোগ্রামিং-ই জীবন, আরেক শিক্ষকসমাজ ‍বোঝায় ধর্মই জীবন, আরেক শিক্ষকসমাজ বলে রসায়নই জীবন কিংবা ডাক্তারই জীবন, আরেক বুদ্ধিমহল বলে রাজনীতিই জীবন কিংবা প্রশাসনই জীবন, আর আমাদের মনমস্তিষ্কে তো বদ্ধমূল হয়েই আছে পরীক্ষায় ভালো ফলাফলই জীবন- জীবনের অন্যদিকগুলো জীবনই না, জীবনের অংশ হলেও ততোটা গুরুত্বপূর্ণ না । এতে করে একটা প্রজন্ম একটি নির্দিষ্ট বিষয়েই সারাজীবন বুঁদ হয়ে থাকছে । জীবনে যে আরো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থাকতে পারে সেটা চিন্তায় করতে পারেনা । অথচ আমাদের এই যান্ত্রিক, আত্মাহীন, প্রগতিহীন জীবন স্থবির ছাড়া কিছুই নয় । যন্ত্র সভ্যতা আনেনি, সভ্যতা এনেছে মানুষ । আর মানুষ যখন যন্ত্র হয়ে যাবে তার দ্বারা পরিবর্তন সম্ভব না । যেমনটি পরিবর্তন হচ্ছেনা আমাদের প্রচলিত দুর্নীতি, সহিংস-বিদ্বেষমূলক মানুষ মারার রাজনীতি, অন্যায়-অপকর্ম, জুলুম-নির্যাতনমূলক সমাজব্যবস্থা থেকে শান্তির কোনো জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার ।

মানুষগুলো আজ একেকটা যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে । স্থায়ী কোনো প্রভাবই ফেলছেনা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো । এই দেখুন না- দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো যখন রাজনীতির উপহার পেট্রোলবোমায় ঝলসে যাচ্ছে, বার্ণ ইউনিটে দগ্ধ মানুষ ও তাদের আত্মীয়স্বজনগুলো আহাজারি করছে, কাঁদছে তখন সারাবাংলাদেশ কাঁদলো, আমরাও কাঁদলাম । আবার যখন ক্রিকেটীয় উন্মাদনায় সারাবাংলাদেশ আনন্দ করছে তখন আমরাও আনন্দ করছি । ঠিক এসময়টাতে আমরা ভুলে গিয়েছি ঝলসে যাওয়া মানুষগুলোর কথা, যারা রাজনীতির বলি হয়ে সংসার-পরিজনকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেছে । এককথায় আমরা রোবটের মতো নির্দিষ্ট যান্ত্রিক ইন্দ্রিয়াধীন হয়ে গিয়েছি । কাঁদতে হয় কাঁদি, হাসতে হয় হাসি, নাচতে হয় নাচি । কিন্তু স্থায়ী কোনো প্রভাবই ফেলেনা আমাদের চিন্তাচেতনায়-বিবেকে । ফলে প্রোগ্রামিং-এর লুপিং-এর মতো বারবার সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটছে, সমাধান আর হচ্ছেনা । বাংলা নববর্ষে যে ঘৃণ্য ঘটনাটি ঘটে গেলো এটা নিয়ে লাফালাফি করেও কোনো লাভ নেই, দেখা যাবে কিছুদিন পর নতুন কোনো ঘটনায় এটা কালের স্রোতে ভেসে গেছে কিংবা আরেকটা লোমহর্ষক ঘটনায় এটা চাপা পড়ে গিয়েছে ।

‘হচ্ছে- হোক- হতে দাও’ এই মনোভাব একদিনেই গড়ে উঠেনি । ধীরে ধীরে অগ্রজ প্রজন্মের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আর আত্মকেন্দ্রিকতাই উপহার দিয়ে গেছে এমন একটা প্রজন্ম, যারা মনে করে আমি এম,বি,এ পাস করে ভালো একটা কোম্পানির ম্যানেজার হতে পারলেই দেশের উন্নতি হলো আর দুর্নীতি? সেটা দুদকের দেখার বিষয় । এরকম প্রতিটা পেশাজীবীরই মনোভাব । অথচ ক্ষতির বেলায় সবাই ক্ষতিগ্রস্থ । আজ অন্যের বোনকে ধর্ষণ-শ্লীলতাহানি করছেন আপনি, আগামীকাল আপনার বোন, আপনার মা, আপনার স্ত্রী, আপনার মেয়ে সেই পরিস্থিতির শিকার হবেনা তার কি নিশ্চয়তা? আপনি সেই অপকর্ম করলেও হবে না করলেও হবে । হাতগুটিয়ে বসে থাকাটাই হবে আপনার আমার অন্যায় । আর পেশাদার ধূর্তবাজ বুদ্ধিজীবির উপর নির্ভরতা নয়, নির্ভরতা নয় কোনো রাজনৈতিক দলের উপর, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে । যে যেখানে আছি সেখান থেকেই শুরু করি অন্যায়ের প্রতিবাদ । ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দল-মত নির্বিশেষে শুধু শান্তির লক্ষ্যে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই । আমাদের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য-বৈষম্যগুলো বাদ দিয়ে আসুন আমরা এক হই পরবর্তী সুন্দর একটা প্রজন্ম গড়ার, যে প্রজন্ম মহাকাশ নিয়ে চিন্তার পাশাপাশি চিন্তা করবে দেশের, দেশের পাড়া-মহল্লা, আপামর মানুষের, চিন্তা করবে আত্মিক উন্নতির ।

দেশ কারো একার নয়, চেতনা কারো উত্তরাধিকার নয়, মুক্তিযুদ্ধ কারো ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ধর্ম-প্রগতি কোনো গোত্র বা দলের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, আমরা প্রত্যেকে সেই সম-দাবিদার, আমাদের প্রত্যেকের রয়েছে সেই সমাধিকার । আমাদের দেশকে নিয়ে আমাদেরকেই ভাবতে হবে ।

অব্যক্ত কথা


জানিস, সবাই কেমন জানি বদলে যাচ্ছে !
একসময় সবাইকে বিশ্বাস করতাম । যখন থেকে গোমর ফাঁস হয়ে যেতে থাকলো, বিশ্বাসের সুঁতোর মালা থেকে একটা একটা করে পুঁথি ছিঁড়তে শুরু করলো । আজকাল মানুষকে বিশ্বাস করতে খুব ভয় লাগে । আচ্ছা, মানুষের মনের ভিতরে ঢুকে গিয়ে সব দেখে ফেলাটা কি অসাধারণ কিছু? তবে আমি পারি কেনো? সেদিন খুব বিশ্বাসী একটা বন্ধুর অন্তর্নিহিত দৃশ্যটা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম ।

বিশ্বাসী মানুষের তালিকা দিনে দিনে খুব ছোট হয়ে আসছে । জানিনা, কখন যে সেই তালিকায় শূণ্যতা দেখা দেবে । এখন প্রায় মনে হয়, বিশ্বাসটা যুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, আগে কাউকে বিশ্বাস করতাম ভালোবেসে, আর এখন---- ।

আচ্ছা, বলতো- মানুষ কেনো এতো প্রতিশোধপরায়ণতা
আর হিংসুটে হয়? ও হ্যা, আরেকটা জিনিস আছে- নিজেকে প্রদর্শণকরার আদিম ইচ্ছা ।

আত্ম-প্রদর্শণের এই প্রতিযোগিতায় আমার মতো প্রতিবন্ধীরা কতটা অসহায়, তাই না?

জানিস রে মৃত্যু, দিনেদিনে আমি না খুব একা হয়ে যাচ্ছি । বলতো- মানুষগুলো পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে নাকি আমি নিজেই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছি?

মনে আছে তোর সেদিনের কথা । তোর থেকে দূরে থাকার জন্যই আমার জন্ম হলো । ভেবেছিলাম তুই খুব খারাপ মনের আর তোকে মোটেই বিশ্বাস করা যায় না । কিন্তু জীবন পেয়ে দেখলাম- আমার ধারণার পুরোটাই ভুল । তুই সত্যিই অনেক ভালো । জীবনের অবসাদ দূর করে শান্তি দিতে পারিস । অন্ধকার রাতে যখন কেউ থাকেনা কথা বলার, তখন তোকেই দেখতে পায় । তুই সেই চিরচেনা বন্ধু ।

মাথাটা খুব ব্যাথা করছে । হাত -পা নড়াতে পারছিনা । ডাক্তার বলেছিলো- আমার রোগটা দিনেদিনে বাড়ছে । আব্বু-আম্মু অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে । লাভ হয় নি । হবে কী করে ! আমি তো মন থেকে চাই নি সুস্থ হতে । মন থেকে কারো ভালোবাসা না পেলে, জোর করে পেয়ে কী লাভ ! জানি, মিতু আর পাভেলরা আজকে যদিও আমার সাথে খেলতে চাইছেনা, আড্ডা দিতে চাইছেনা কিন্তু আমি নিশ্চিত- আমি সুস্থ হয়ে গেলেই তারা আমাকে খেলায় নিবে ।

আমি কত স্বপ্ন দেখতাম সবাইকে নিয়ে । কিন্তু যাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম তারাইতো আমাকে...
যাক গে সেসব কথা । মৃত্যু বন্ধু, তোর কি কোনো বন্ধু আছে যে তোকে খুব মিস করে; তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে?
এই দেখো বোকাছেলের কান্ডটা ! কাঁদছিস কেনো? তুই কাঁদলে মানুষগুলো হাসবে ।আমাকে একটা গল্প শুনিয়ে ঘুমিয়ে দেনা । মাথাটা খুব ব্যাথা করছে, ভালো লাগছেনা ।

[গল্পটা আমাকে স্বপ্নে কেউ বলেছিলো । এরপর থেকেই ভাবছি- অসুস্থ কে? বিশ্বাস হারানো মানুষটি নাকি আমরা মানুষের মুখোশ পড়া দোপায়ে হিংস্র প্রাণীগুলো?]

ধর্মব্যবসায়ীদের কূপমণ্ডূকতায় ব্যর্থ হল লেনিনের পরিকল্পনা (বামদের জন্য শিক্ষনীয়)


সারা দুনিয়ায় কিছুদিন আগে বাম আদর্শের জয়জয়কার ছিল, এখনও বাম আন্দোলন টিকে আছে তাত্ত্বিকভাবে, বহু মানুষের মুখে বামপন্থীদের নাম সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে এখনো উচ্চারিত হয়। পুরো রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা, ভারত উপমহাদেশের বুদ্ধিজীবী মহল, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ বাম ঘরানার। আমরা বাম আদর্শের উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে যতটুকু জানতে পারি তা হচ্ছে, ইংল্যান্ডে যখন প্রথম রাষ্ট্রীয়জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা আরম্ভ হলো তখন থেকেই মানুষ জাতীয় চরিত্রে চরম বৈষয়িক ও বস্তুবাদী হয়ে পড়তে আরম্ভ করল। তখন অর্থনীতি ছিল সুদভিত্তিক পুঁজিবাদ এবং শাসনতন্ত্র ছিল সামন্তবাদ। সুদী অর্থনীতির ফলে সমাজের কেউ হয়ে গেল অকল্পনীয় অর্থ-বিত্তের মালিক আর কেউ হয়ে গেল দারিদ্র্যের নির্মম শিকার। শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কাঁচামাল থেকে ব্যবহার্য সামগ্রী উৎপাদনকারী যে বিপুল সংখ্যক কারখানা সৃষ্টি হলো, প্রায় কোটি কোটি মানুষকে একরকম বাধ্য করা হলো সামান্য মজুরিতে সেই কারখানাগুলোতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করার জন্য। সামন্তবাদী রাষ্ট্রগুলোতে এই শ্রমিকবর্গসহ নিু শ্রেণির মানুষগুলোর শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদির কোনো ব্যবস্থা রইল না, তারা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হলো। আজকের সংশোধিত পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি দাওয়া ও আন্দোলনের কারণে, শ্রমজীবী মানুষের বিক্ষোভের ভয়ে কিছু কিছু অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আজ থেকে ১০০ বছর আগেও এই গণতন্ত্রের সমাজব্যবস্থায় শ্রেণিহীন মানুষের দুর্গতির কথা পড়লে চোখের পানি ধরে রাখতে কষ্ট হয়। এই অবস্থার কারণে ইউরোপের জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন যে, কী করে এই মানুষগুলোকে মুক্তি দেয়া যায়? সেই জ্ঞানী-গুণী, মুক্তচিন্তার মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলেন কার্ল মার্কস, লেনিন এরা। তারা চেষ্টা করলেন মানুষকে অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি দেবার জন্য। যতটুকু বোঝা যায় তাদের অভিপ্রায় ভালোই ছিল। তখন তারা চিন্তা করে দেখলেন যে, ধর্মের মধ্যে সমাধান খুঁজে লাভ নেই, সেগুলো মানুষকে বুঁদ করে ফেলে, সেগুলো মানুষের ব্যবহারিক জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান দিতে অক্ষম।

ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পাশবিক পীড়নের পর বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মানবজাতির সামনে আশার বাতি নিয়ে হাজির হয়েছিল সমাজতন্ত্র নামক মতবাদ। পতঙ্গ যেমন অন্ধ মোহে আগুনের শিখায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি সারা পৃথিবীর তরুণ যুবক সমাজতন্ত্রের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। মানুষের ভিতরে বিপ্লবের যে চিরন্তন আকাক্সক্ষা সুপ্ত থাকে সেটা জাগিয়ে তুলেছিল সমাজতান্ত্রিক পুরোধারা। কিন্তু আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পতঙ্গের যা পরিণতি হয়, অর্থাৎ মৃত্যু; সমাজতন্ত্রের বেলাতেও সেটাই ঘোটেছে। চাকচিক্যময় মাকাল ফল সদৃশ এই মার্কসীয় মতবাদের অভ্যন্তরে যে বিষময় কদর্যতা লুকিয়ে আছে তার প্রকাশ ঘটতে ৭৫ বছরের অধিক সময় পার হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর যে কয়টি স্থানেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেখানেই সৃষ্টি হয়েছিল চূড়ান্ত ভারসাম্যহীনতা, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, পদদলিত হয়েছিল মানবতা। মানুষের আত্মা ত্রাহিস্বরে চিৎকার করে উঠেছিল কেবল মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নিয়ে। অথচ এই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে মার্কস লেনিন প্রমুখ তাত্ত্বিকরা আখ্যা দিয়েছিলেন ‘স্বর্গরাজ্য’। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে অর্থাৎ রেডিও, টেলিভিশনে-এ কথা লক্ষ কোটি বার বলা হয়েছে যে সাম্যবাদী সমাজে, দেশে থাকা স্বর্গের সুখে থাকার সমান। এখানে লক্ষণীয় যে, তারা তাদের সমাজটাকে সর্বদাই স্বর্গ (চধৎধফরংব) বলে বাকি পৃথিবীকে সাম্যবাদ গ্রহণ করে স্বর্গে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত কঠিন বাস্তবতাই প্রমাণ করে দিয়েছে যে সমাজতন্ত্র যে স্বপ্ন দেখিয়েছে সেটা বাস্তবতার ঠিক উল্টো।

কমিউনিস্টদের এই নিদারুণ ব্যর্থতার কারণ আগেই বলেছি যে মানুষ কেবল দেহ নয়, তার আত্মাও আছে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন কার্ল মার্কসের তত্ত্বের বাস্তব রূপকার ভ.ই.লেনিন কিন্তু এর কোনো সমাধান করে যেতে পারেন নি দু’টি কারণে। প্রথমত ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র, এবং দ্বিতীয়ত বিকৃত ইসলামের ধারক-বাহক কূপমণ্ডূক মোল্লাদের ইসলাম-পরিপন্থী ফতোয়াবাজি।
সমাজতন্ত্রীরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার ধ্বজাধারী মনে করেন এবং পক্ষান্তরে ইসলামসহ সকল ধর্মমতকে একচেটিয়াভাবে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করেন, সকল ধর্মকে স্থবির, কল্পকাহিনী, জড়তা, কূপমণ্ডূকতা বলে গালিগালাজ করেন, বিশেষ করে মুসলিমদেরকে পশ্চাৎপদ, গোঁড়া, মধ্যযুগীয়, অন্ধ বলেন। এটা বলেন কেন? এটা বলার কারণ, আপনারা মসজিদে, মাদ্রাসা, খানকার চার দেয়ালের ভেতরে দাড়িওয়ালা-টুপিওয়ালা, লম্বা পাগড়ীওয়ালা লেবাসধারী মওলানা ও পীর সাহেবদেরকে দেখে মনে করেন এটাই বুঝি ইসলাম। কিন্তু না, এটা প্রকৃত ইসলাম নয়। প্রকৃত ইসলামের অনুসারীরা কখনও স্থবির হতে পারেন না, প্রকৃত ইসলামের চেয়ে বিস্ফোরণমুখী, গতিশীল, বৈপ্লবিক আর কিছু হতে পারে না। তারা কখনও কূপমণ্ডূক নয়, তাদের সংস্কৃতি রুদ্ধ নয়। দুনিয়াজোড়া তাদের দৃষ্টি। তারা নির্দিষ্ট কোনো পোশাকী গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারেন না, কারণ যে জীবনব্যবস্থা এসেছে সারা পৃথিবীর সব ভৌগোলিক পরিবেশের মানুষের জন্য, সেই জীবনব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট পোশাক থাকতে পারে না; ঠিক যে কারণে গণতন্ত্রে বা সমাজতন্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই।

ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা ষড়যন্ত্র করে তাদের সকল উপনিবেশগুলোতে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে একেবারে চূড়ান্ত একটা বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দিয়ে মুসলিম জাতিকে একেবারে বিপরীত দিকে পরিচালিত করছে। এই ইসলাম যে কতটা বিকৃত তার একটি প্রমাণ লেনিনের জীবন থেকে দেওয়া যায়। ঘটনাটি আমরা উদ্ধৃত করছি মাওলানা শামস নাবীদ উসমানী রচিত Now of Never গ্রন্থ থেকে যা অনুবাদ করেছেন স.স.আলম শাহ। অনুবাদ পুস্তক ‘বেদ-কুর’আন ও স্বজাতির বিভেদ’। আরও দেখুন উর্দু পত্রিকা ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ এর ২৮তম সংখ্যা, ১৯৮২, সূত্র: জগদগুরু মুহাম্মদ (সা.), রেনেসাঁ পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা-২০৯-২১০।

ঘটনাটি হলো: রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড লেনিন বিশ্বধর্মের পর্যালোচনা করার পর ইসলামে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি রুশীয় জনগণের ইসলাম গ্রহণের আশা পোষণ করতেন। কথিত আছে যে, জনৈক বাকরা খাঁন নামক বুযুর্গের সংস্পর্শে আসার পর তিনি ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হন। তার দ্বারা লেনিন যথেষ্ট প্রভাবিত হন। যাই হোক, লেনিন সচেষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু মিশরীয় উলামাদের অজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের ষড়যন্ত্রের ফলে এই সুযোগ হাতছাড়া হয়।

রাশিয়ার জার-তন্ত্রের পতনের পর লেনিন হন সর্বময়কর্তা। তিনি কমিউনিস্ট প্রশাসন স্থাপন করেন। একদিন তিনি নিকটতম বন্ধুবর্গের বৈঠক ডাকেন। তাতে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার গঠনে সফল হয়েছি কিন্তু একে সুদৃঢ়, সুবিন্যাস্ত, শাশ্বত ও সার্বজনীন করে তোলার জন্য আমাদেরকে এমন এক জীবনব্যবস্থা দিতে হবে যা হবে মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের শুধুমাত্র অন্নবস্ত্রই যথেষ্ট নয়। আত্মার খোরাকও প্রয়োজন। ক্ষুধার্ত মানুষকে রুটি দিয়ে শান্ত রাখা যায় একটা পর্যায় পর্যন্ত। এ পর্যায় অতিক্রান্ত হলে মানবাত্মা তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠে। এ তৃষ্ণা নিবারণের কোনো উপকরণ-ই আমাদের কাছে নেই। আছে ধর্মাচারের মাধ্যে। আমি পৃথিবীর সব ধর্ম-ই গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছি, সবখানে পেয়েছি আফিমের আবেশ। শুধুমাত্র একটি ধর্মকেই পেয়েছি প্রাণবন্ত জীবনব্যবস্থা হিসেবে। এক অনিরুদ্ধ গতিময়তা এর মধ্যে বিদ্যমান। এটাই আমাদের প্রগতিশীল জীবন ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সহায়ক বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এখন সে ধর্মের নাম আমি শুধু বলব। এ ব্যাপারে মত প্রতিষ্ঠায় আপনারা তাড়াহুড়ো করবেন না। কেননা প্রশ্নটি কমিউনিজমের জীবন মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত (Don’t hasten to form your own conclusions because this question pertains to the life and death of Communism.) আপনারা সময় নিয়ে ভাবনা চিন্তা কোরুন। হতে পারে আমার ধারণা ভুল, কিন্তু আমাদের আত্মপ্রশান্তির জন্য ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। আমি মনে করি যে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজতন্ত্রের নিকটতম (Islam is the only religion closer to the economic programmes of Communism.)” এ কথা শুনে সমবেত লোকদের মধ্যে হইচই শুরু হয়ে যায়। তখন লেনিন তাদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন- আজ থেকে পুরো এক বছর পরে পুনরায় আমরা একত্রিত হব। আর তখনই আমরা ঠিক করব কমিউনিস্টদের ধর্মাশ্রয়ী হওয়া উচিত হবে কি না, যদি গ্রহণ করতেই হয় তাহলে সে ধর্ম কোনটি?”
লেনিন
লেনিন

ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর এ সংবাদ অবহিত হয়ে এটাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের অশনি সংকেত মনে করল। তারা ভাবলো, যদি উদীয়মান শক্তি কমিউনিস্ট রাশিয়া এবং বিপন্ন বিপর্যস্ত আধমরা লড়াকু মুসলিম জনগোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে ওপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠবে। সুতরাং ব্রিটিশ কূটনৈতিকরা তৎপর হয়ে উঠল বিশ্বব্যাপী। মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া হল এমন এক সংবেদনশীল প্রশ্ন যে কমিউনিজম হলো আল্লাহবিরোধী মতবাদ। ইসলামের জন্য আল্লাহদ্রোহী এই মার্কসীয় মতবাদ কি গ্রহণীয় হতে পারে? ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে মুসলিম বিশ্বের আলেম ওলামার নিকট থেকে ফতোয়া নেয়া হল। একইভাবে এ প্রশ্নে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল। আলেমগণ এ সংক্রান্ত প্রশ্নের পটভূমি ও এর অর্ন্তনিহিত উদ্দেশ্য অবগত ছিলেন না। ফলে আল-আযহারের ওলামাগণ এরূপ নেতিবাচক বিধান প্রকাশ করলেন যা ব্রিটিশ প্রশাসন একান্তভাবে চাইছিল। অতঃপর যা হবার তাই হলো। ব্রিটিশ সরকার এ ফতোয়া ছাপিয়ে সারা বিশ্বে বিলি করল। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অনেক এলাকায় মুসলিমদের অনেকের কাছে এ ফতোয়ার কপি রয়েছে। এ সংবাদ লেনিনও অবগত হলেন। এতে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন- ‘আমার ধারণা ছিল মুসলিমরা কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রমাণ করল, অন্য আর সব ধর্মাবলম্বীদের মতো মুসলিমরাও গোঁড়া, তত্ত্বসর্বস্ব ও সংকীর্ণ।’ ফলশ্রুতিতে পরিকল্পনা অপূর্ণ থেকে গেল আর লেনিন বিরোধীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

সেদিন লেলিনের এই প্রস্তাব আলেমরা নিতে পারেন নি। কারণ, তখন মদীনা, কায়রো, লাহোর, দিল্লী, কলকাতা ইত্যাদি জায়গায় যে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ব্রিটিশ পণ্ডিতদের তৈরি করা সিলেবাস মোতাবেক যে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া হোচ্ছিল (এবং এখনও হচ্ছে) সেটি আদৌ আল্লাহ-রসুলের ইসলাম নয়। সেই ফতোয়া দানকারী ধর্মব্যবসায়ীরা ছিল কূপমণ্ডূক মোল্লা যারা প্রকৃত ইসলামের সাথে সম্পর্কহীন। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব প্রত্যাখ্যান করে তারা ব্রিটিশ বেনিয়াদের তৈরি মতবাদ ও সার্বভৌমত্ব তারা মেনে নিয়েছে। আজও পৃথিবীময় ধর্মব্যবসায়ীদের পণ্যরূপী সেই অন্তঃসারশূন্য, স্থবির ইসলামকেই আপনারা দেখছেন এবং অনর্থক আল্লাহ-রসুলের প্রতি বিদ্বেষ লালন ও বিস্তার করে যাচ্ছেন।

সেদিন মুক্তমনা মানুষ লেনিনের পুরো রাশিয়ার জনগোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে ইসলামকে সহায়ক ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণকে যে ধর্মব্যবসায়ীরা নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাদের মনোভাব ছিল অনেকটা এমন- ঐ ব্যাটা তো নাস্তিক, কাফের। ওকে ইসলাম ধর্মের বিধান ব্যবহার করতে দিলে তো ইসলামের জাত যাবে। আজও একই ধারণা ধর্মজীবীরা পোষণ করেন। তাদের জানা দরকার আল্লাহর রসুলের সময় রসুল যখন প্রকৃত ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছিলেন তখন তাঁর আহ্বানে ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাস্তিক, মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক সব জাতির মানুষ ইসলামের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এমন কি রসুলাল্লাহ খ্রিষ্টান শাসক নাজ্জাশির মৃত্যুর পর সাহাবিদেরকে বলেছিলেন যে, তোমাদের একজন ভাই মৃত্যুবরণ করেছেন। রসুলাল্লাহ নিজে তার জানাজার সালাহ কায়েম করিয়েছিলেন। কারণ নাজ্জাশি রসুলাল্লাহর আসহাবদেরকে অকপটে সহযোগিতা করেছিলেন। আমাদের বিশ্বাস লেলিনের উদ্যোগ গৃহিত হলে রাশিয়াতে কমিউনিজমের যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হওয়ার যে দুর্বিসহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তা না হয়ে রাশিয়ার ইতিহাস হতো ভিন্ন ও অনন্য।

১৯৯০-তে সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় মার্কসবাদীদের তীর্থভূমি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়, তারপরই সারা দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র নিক্ষিপ্ত হয় আস্তাকুঁড়ে। সে সময়ের গোঁড়া সমাজতান্ত্রিকরা আজও দুর্বল কণ্ঠে সমাজতন্ত্রের জয়গান করেন কিন্তু বাস্তবে তারা সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা মার্কস লেলিনের আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছেন এবং বর্তমানে তারা চরম পূঁজিবাদী গণতন্ত্রের অনুসারী। আপনারা পুঁজিপতিদের অধীনে মন্ত্রিত্ব করছেন, রাজনীতি করছেন, শ্রেণিহীন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা বাদ দিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন আর সকল ধর্মের পুরোহিতরা যেমন ধর্মকে বিক্রী করে জীবিকা নির্বাহ করেন আপনারাও মার্কস, লেনিন, এঙ্গেলসকে বিক্রী করছেন। আপনারা খামোখা মানুষদেরকে সাম্যবাদের কথা বলে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। আপনারা জানেন যে, আপনাদের সিস্টেম ব্যর্থ ও অচল। এখন গণতন্ত্রের দিন এসেছে, তাই সেদিকেই এখন ছাতা ধরে আছেন। এই কথিত পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের অধীনে থাকায় আপনাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত জীবন ঋষ্টপুষ্ট হচ্ছে।

আপনারা যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন আপনাদের প্রতি আমাদের শেষ কথা হলো, যদি আপনারা সত্যিই মানুষের কল্যাণ চান, তবে আপনাদের উচিত প্রকৃত ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা যেটা প্রচণ্ড, দুর্দান্ত গতিশীল এক জীবনব্যবস্থা। সেটা মোল্লাদের কাছে নেই, সেটা আল্লাহ দয়া করে হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। সেটা প্রতিষ্ঠিত হলে পৃথিবীতে থাকবে না কোনো ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ, থাকবে না ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ, শ্রেণিবৈষম্য, পুরো মানবজাতি হবে এক জাতি। মানব সমাজে এমন অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে যে, প্রত্যেকের নিজের মেধা ও পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থের উপর যেমন পূর্ণ অধিকার থাকবে, অপরপক্ষে সমাজের প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল হয়ে যাবে, মানুষ তো দূরের কথা একটি কুকুরও বুভুক্ষ থাকবে না। ধনীর সম্পদে দরিদ্রের ন্যায্য অংশীদারত্ব থাকবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার হাতে মজুরি অর্পিত হবে। মালিক ও শ্রমিক এক টেবিলে বসে খাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য লাইসেন্স লাগবে না, মিথ্যা না বলে যত খুশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা যাবে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের আঞ্চলিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকবে, সঙ্গীত, নাট্য, চিত্রকলায় কোনোরূপ বাধা আরোপ করা হবে না, কেবলমাত্র যা কিছু মানুষের ক্ষতির কারণ হয় সেগুলি বর্জনীয় বলে বিবেচিত হবে। আমরা বলি না যে, আপনারা আল্লাহ বিশ্বাসী হয়ে যান, মো’মেন হয়ে যান, পরকালে বিশ্বাসী হয়ে যান। আল্লাহর প্রতি কে ঈমান আনবে কে আনবে না সেটা তারা আল্লাহর সঙ্গে বুঝবে। সুতরাং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করানো আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ আল্লাহর শেষ রসুলের আনীত আকাশের মতো উদার, সমুদ্রের মতো বিশাল, দুর্দান্ত গতিশীল ইসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে মানবজাতিকে শান্তিময়, নিরাপদ, ন্যায় ও সুবিচারে পূর্ণ একটি জীবন উপহার দেওয়া। দল, মত, পথ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, আস্তিক, নাস্তিক নির্বিশেষে সকল মনুষ্য সন্তানের প্রতি আমাদের একটিই প্রশ্ন, আপনি মানবজাতির সার্বিক জীবনে সুখ, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি ও ন্যায় চান কি না। যদি চান, তাহলে অন্য কারও কথায় প্রভাবিত না হয়ে জানুন আমরা কী বলি।
(আংশিক সম্পাদিত)


লেখক: রিয়াদুল হাসান,
 দৈনিক বজ্রশক্তির সাহিত্য্য বিষয়ক সম্পাদক ও হেযবুত তওহীদের সদস্য।

একটি পেট্রোল বোমার গল্প


একটি পেট্রোল বোমার গল্প

আমি পেট্রোল বোমা, শান্তিকামী মানুষের কাছে চরম ঘৃণ্য এক বস্তু । জানি এ ঘৃণা নিয়েই আমাকে আজীবন বেঁচে থাকতে হবে । একটু আগেও আমি নিরাশ বা হতাশাগ্রস্থ ছিলামনা এই ভেবে যে, একটা পক্ষ আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে । ভালোবাসে তারা আমাকে প্যান্টের পিছনের পকেটে রাখে । যে পকেটে মানিব্যাগ, প্রিয়তমার উপহার রুমাল-ফুলের মতো দামি দামি জিনিসের ঠাঁয়, সেখানে আমার আজকে অতিসাবধানী অবস্থান । তবুও আজকে আমি আমার সকল অহমিকা মাটিতে ধূলিস্মাত করে  আপনাদের দ্বারস্থ হয়েছি । বলতে খুব লজ্জা লাগলেও তবু বলতে হচ্ছে- যে পেট্রোল বোমা রাতের আঁধারে যানবাহনের উপর নিক্ষিপ্ত হয়ে সব জ্বালিয়ে অঙ্গার করে  দেয়, আকাশে-বাতাসে ধ্বংসলীলা চালায়, যার বিস্ফোরণে বাংলার আকাশ ২৫ শে মার্চের ন্যায় লাল-আঁধারিয়ার রূপ নেয়, যার ঔদ্ধ্যতায় বার্ণ ইউনিটে চলে শোকের মাতম, একেকটা মানবদেহের উপর জারি হয় সমন, সেই পেট্রোল বোমাই কিনা আজ ভয়ে দিনকাল কাটাচ্ছে ! জানি, আমার মতো পিশাচের মুখে এমনটি মানায় না । হয়তো আপনাদের খুব হাসি পাচ্ছে । না, এ আমার কোনো ছল-চাতুরী নয়, নয় প্রতারণা, উপহাস, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য । সত্যিই আমি আজ খুব ভীত । হে বিশ্বমানব,  আমি মোটেই এমনটি ছিলাম না । কালের গর্ভে আমাকেও একদিন চলে যেতে হবে ।  তাই চলে যাবার আগে আপনাদেরকে সত্যটা জানিয়ে যেতেই হবে । নইলে পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় আমার নামটা যতোটা না ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করা হবে, তারচেয়ে শতগুণ আমাকে অভিশাপ পেতে হবে আপনাদের কাছ থেকে । আজ শোনাতেই হবে আমার জীবনের আত্মকথা ।
একটি পেট্রোল বোমার গল্প
পেট্রোল বোমা


প্রাগৈতিহাসিক হওয়ার পরেও পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের অস্তিত্ব। ভূগর্ভস্থে বেশ সুখে শান্তিতে পরিবারস্থ সবাই মিলে অবসর জীবনযাপন করছিলাম । তখনও পৃথিবীর মানুষ আমাদের নামকরণ করেনি । করবে কী করে? তখনো তো আমাদেরকে তারা আবিষ্কারই করতে পারেনি ।  বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের চিন্তাভাবনা, বুদ্ধি-বিবেক, আবিষ্কার ও প্রায়োগিক ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার পর যান্ত্রিক সভ্যতার সূচনালগ্ন হিসেব তারা প্রথমে আবিষ্কার করে চাকা । অতঃপর কোনো এক রৌদ্রময় দুপুরে বিশ্বসভ্যতায় হাজির হয় ইঞ্জিন নিয়ে । সময়ের প্রেক্ষিতে সেই ইঞ্জিনের মধ্যেও বেশ পরিবর্তন আসে । যখন ভূগর্ভস্থ ভেদ করে আমাদেরকে বের করে এনে আবিষ্কার করলো আমরা দাহ্য এবং  ইঞ্জিনের জন্য উত্তম এক জ্বালানি, সেদিন থেকেই পৃথিবীর মানুষের কাছ থেকে আমরা সুন্দর একটা নাম পেলাম- ‘পেট্রোল’ । আপনাদেরকে বুঝাতে পারবোনা সেদিন আমরা কতটা খুশি হয়েছিলাম । একে তো, মহান  স্রষ্টা আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে আমাদের অলসতা থেকে রক্ষা করেছেন, তার উপর সুন্দর একটা নাম পাওয়া, চারটি খানি কথা নয় । এ আনন্দে কয়েক শতাব্দী ধরে আমরাসহ আমাদের স্বজাতিরা সবাই একনিষ্ঠভাবে মানুষের গোলামি করে চললাম । দিন নেই, রাত নেই, ইঞ্জিনে পিষে, পুড়ে আমাদের যৌবন নিঃশেষ করে দিচ্ছি । মানবতার কল্যাণে  স্বার্থত্যাগের দৃষ্টান্তদের মধ্যে আমরাও ছিলাম, যদিও সে স্বীকারোক্তি করে পৃথিবীর ইতিহাস কাগজ-কলম খরচ করার সাহস রাখেনা ।  তবুও আমাদের বিন্দুমাত্র আফসোস নেই, নেই কোনো ক্ষোভ কিংবা প্রতিদান পাবার খায়েশ। কারণ  স্রষ্টার আদেশে আমরা যে, তার এক সৃষ্টির দাস হয়েছি। তাই আপাতত মনিব বলতে এই মানুষই আমাদের প্রভূ । স্বার্থত্যাগ আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্পগুলো এভাবে চলছিলো । কিন্তু আমাদের এই প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় হঠাৎ এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসলো । এরকমটি করতে আমরা একরকম বাধ্য হলাম । যে সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো এটা উপরতলা থেকে আসেনি । আমাদের আপাত মনিব খোদ মানুষগুলো অদ্ভূতভাবে আমাদের উপর এক অন্যায় চাপিয়ে দিলো । যাদেরকে এতো বুদ্ধিমান মনে করতাম, স্রষ্টার ঘোষিত ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ পদবীতে  ভূষিত মানুষগুলো আমাদেরকে যে কাজে ব্যবহৃত করার সিদ্ধান্ত নিলো তার জন্য আমরা বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলাম না । পেট্রোলের পরিবর্তে আমাদেরকে ‘পেট্রোল বোমা’ হয়ে কাজ করতে হবে । অমানবিক সিদ্ধান্ত দেখে আমাদের পরিবারস্থ সবাই খুব আশ্চর্য্য হলো । কিন্তু কিছুই করার ছিলোনা ।
পুলিশের দিকে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমা
পুলিশের দিকে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমা

আমার জন্মটা ঠিক কখন সেটা আজও ঠাওর করে উঠতে পারিনি । তবে প্রথম দিকের অনেক কিছুই আজও চোখে ভাসছে ।  সময়টা ১৯৩৬-৩৯ সাল । স্পেনে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা এতোদূরেই চলে গিয়েছে যে, ন্যাশনালিস্ট আর রিপাবলিকানদের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব-বিরোধ । তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে এসে গড়ায় ।  ইতিহাসে যেটাকে ‘স্প্যানিশ সিভিলিয়ান যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করে । সর্বপ্রথম এ যুদ্ধে মানুষ প্রায়োগিক জন্ম দেয় আমার অর্থ্যাৎ পেট্রোলবোমার । এ যুদ্ধে ন্যাশনালিস্ট আর রিপাবলিকান দুপক্ষই পেট্রোলবোমার ব্যবহার করে । যখন ব্যবহারকারীরা দেখলো আমি দামে সস্তা, আমাকে বানাতে সহজ অথচ খুবই কার্যকরী তখন থেকেই আমার কদর ক্রমশ বেড়ে যায় । তাই আমি বারবার বিস্ফোরিত হয়ে বার বার জন্ম নিই । আমার এ পূনর্জন্মে কতক মানুষ খুবই সুখী আর বেশির ভাগই মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ১৯৩৯ সালে মঙ্গোলিয়া আর মাঞ্চুকোদের মধ্যে যখন সীমান্ত নিয় সমস্যা হচ্ছিলো তখন আবার আমাকে জন্ম নিতে হয় পেট্রোল বোমা হয়ে । ঐ একই সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ বাহিনীরা যখন ট্যাংক নিয়ে ফিনল্যান্ডের অভিমুখে আসছিলো তখন ফিনল্যান্ডের সৈন্যরা নিরুপায় হয়ে আমাকে পূণর্জন্ম দিলো । কারণ ঐ ট্যাংকগুলো ধ্বংস করার আপাত এরচেয়ে ভালো বুদ্ধি তখন ছিলোনা । ফের আমাকে যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় । তবে এ যুদ্ধের নাম 'Winter War'.  যখন দেখলো ফিনল্যান্ডের সৈন্যরা আমার যথার্থ ব্যবহারে সোভিয়েতের ট্যাংকগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম হলো, তখন আমার নাম-ডাক বাতাসের সাথে পৃথিবীর ওপার থেকে এ পারে ভেসে যেতে লাগলো ।  যার ফলে ১৯৪০ সালে ব্রিটিশরা আমাকে নিয়ে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করলো । অর্থ্যাৎ আমি পেতে চললাম ইংল্যান্ডের রাজকীয় সম্মান । এর পরে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি । ১৯৫০-৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে লাল বাহিনী অর্থ্যাৎ কমিউনিস্ট সৈন্যদের বিরুদ্ধে অ্যান্টি কমিউনিস্টরা আমাকে ব্যবহার করলো ।
Winter War- এ ব্যবহৃত পেট্রোল বোমা
Winter War- এ ব্যবহৃত পেট্রোল বোমা

অর্ধপৃথিবীর বেশি জায়গা জুড়ে যখন সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি তন্ত্রমন্ত্রের ধ্বস নামে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, ঠিক তখন থেকে আমার প্রয়োজনীয়তা কমতে শুরু করে । আমি তো ভেবেই বসেছিলাম, আমার বোধহয় আর পূণর্জন্ম হবেনা, ফিরে যেতে হবে আদি অবস্থায় । সেই কলকারখানা, সেই ইঞ্জিন । কিছুদিন পরে দেখলাম, আমার ধারণা ভুল । বাংলাদেশের মতো যেসব অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সে দেশগুলোতে কয়েক বছর পরেই সৃষ্টি হয় জাতীয়গত বিভাজন । এ বিভজান গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে । একসময়ের ঐক্যবদ্ধ বাঙ্গালি জাতিটি গণতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে বহুদলীয় দলে-উপদলে বিভক্ত জাতিতে পরিণত হয় । রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, হিংসা, ক্ষমতার লোভে শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ জিয়াউর রহমানের মতো দেশের অন্যতম দেশপ্রেমিক নেতা-নেত্রীদের হত্যা করা হয় । একের পর এক নির্বাচন শেষে দেশ আদর্শিক চেতনায় বহুভাগে বিভাজিত সৃষ্টি হতে শুরু করলো । গত ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে পর থেকেই এদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ক্রমশ খারাপের দিকে অগ্রসর হওয়ায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা ষোলো কোটি মানুষ, কিন্তু প্রস্তুত ছিলাম আমি পেট্রোল বোমা । কারণ আমি কালের সাক্ষী । আমি দেখেছি একটা জাতি কী করে অন্যজাতির বিরুদ্ধে কত নিষ্ঠুর হয় ! কী করে পারে বিপক্ষের সৈন্যসামন্তকে । কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট আশ্চর্য্যবোধ করছি । আশ্চর্য্য হয়েছি এ কারণেই যে, একই দেশে বসবাস করে, একই পাড়ায় দিনরাত্রি যাপন করে । অথচ কেবলমাত্র আদর্শিক দ্বন্দ্ব-বিরোধিতার সূত্র ধরে এরা একে অন্যের কী সর্বনাশটাই না করছে ! গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে প্রতিটা দলই হরতাল-বিক্ষোভ-পিকেটিং করে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি করেছে আর এখনও করছে, ভবিষ্যতেও করবে । কেউ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে, কেউ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে, কেউ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে সাধারণ মানুষের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে । রেহায় পাচ্ছেনা দুধশিশু থেকে শুরু করে প্রায় অর্ধমৃত বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ।  দেশে রাজনৈতিক ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে কিছুদিন আগে আমার দুঃসম্পর্কের আরেক জাত ভাই ‘ককটেল’ ব্যবহার করা হয়েছিলো । কিন্তু আন্দোলনে তৃপ্তি না পাওয়ায় অবশেষে ইতিহাস থেকে বাছাই করে আমাকে আবারো আমন্ত্রণ জানানো হলো ।

আমন্ত্রণ জানানোর আগ পর্যন্ত আমিও অন্যসব পেট্রোলের মতো নিরীহ, মানবতাবাদী, স্বার্থত্যাগী দাহ্য, তৈল ছিলাম । কিন্তু আজ রাতে মনিব আমাকে বলে গিয়েছে, আজকের পেট্রোল আগামীকাল ভোররাতে পেট্রোলবোমায় পরিণত হবে । মনিবের এমন কথায় প্রতিদিনের মতো আমার মনে প্রফুল্ল লাগছিলোনা । ভেবে খারাপ লাগছিলো এ কারণে যে, এতোদিন তো মানবকল্যাণে কাজ করেছি । আর আজকের এই ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে আমি জড়িত হবো? মনিব হয়তো  আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরেছিলো । তাই অতি সুকৌশলী হয়ে আমাকে বলেছিলো,

-তুইতো দেখছি আস্ত বোকা ! আরে এটাও তো মানবকল্যাণ মূলক কাজ । বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্রত্যাগ ।

-মনিব, আমি ঠিক বুঝলামনা?

-আমরা যদি ক্ষমতায় যাই, তবে দেশের মানুষ সুখী হবে । বুঝলি? যে করেই হোক, এই জুলুমবাজ সরকারকে, দলকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া যাবেনা । পেট্রোল বোমার আঘাতে যদি গুটি কয়েক মানুষ মরে তো মরুক । হরতাল-পিকেটিং করে, ককটেল বোমায় আতংক সৃষ্টি করে, পেট্রোল বোমায় মানে তোকে দিয়ে মানুষ হত্যা করে যদি দেশে আমরা ক্ষমতায় গিয়ে শান্তি স্থাপন করতে পারি তবে ক্ষতি কী?  তাছাড়া, তুইতো এতদিন কারখানায়, ইঞ্জিনে জ্বলে-পুড়ে কয়লা হয়েছিস । আজ সুযোগ এসেছে নিজের শক্তিমত্তাকে প্রকাশ করার ।  আজ সুযোগ এসেছে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করার । যে মানুষগুলো তোকে নিযে এতোদিন খেলেছে, পিষ্ট করে মেরেছে তার প্রতিশোধ নেবার সময় এসেছে । তুই আজ থেকে ধ্বংসের আরেক নাম । মহাপ্রলয়ের অঙ্গীকার ।

মনিবের এমন জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে আমি সেদিন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি । এরকম ভাষণ তো এর আগে কেউ দিতে পারেনি ! লাল চামড়ার স্প্যানিশ, ফিনিশদের খাকী পোষাকধারীরা কেউ পারেনি ! অথচ বাংলাদেশের মনিব এ কি শোনালো আমায় !  বুকের ভিতরে তখন থেকেই বিদ্রোহের আগুণ জ্বলতে শুরু করছে। মনের ভিতর সুপ্ত পশুত্ব সেদিন জেগে উঠে আমার হিতাহিতবোধ লোপ পাইয়ে দিয়েছিলো । মনিব একটা কাঁচের বোতলের মুখ খুলে অপেক্ষা করার আগেই আমি অতি সোৎসাহে ঢুকে গেলাম । তারপর সেই বোতলে অনেকগুরো ভগ্ন মার্বেল ও আরও কী কী জানি রাখলো । মুখে একটা সলতে ঢুকিয়ে দিয়ে বেশিরভাগ অংশটা বের করে রাখলো যাতে সেখানে আগুন জ্বালানোর সাথে সাথে আমি বিস্ফোরিত হই অহংকারে ।

আজকের রাতটা যেনো পারই হচ্ছেনা । আমি উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি কখন মনিব এসে আমাকে বিস্ফোরিত করে । অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হলো । শেষ রাতের দিকে । তখনও ফজরের আযান দেয়া হয়নি । পাকা রাস্তার লাইট পোষ্ট গুলোতে আলো জ্বলছে । রাতের আকাশের তারাগুলো মিটমিট করে কী যেনো ভিডিও করছে । ইতোমধ্যে আমার মনিব আরো কয়েকজন  স্বজাতি মনিবকে নিয়ে এসে হাজির । তারাও আমার মতো আরো অনেকগুলো পেট্রোল বোমা নিয়ে এসেছে । এদের কতকগুলো আকারে আমার মতো, কতকগুলো আবার আমার চাইতেও বড় ।
রাস্তার  পাশে একটা বড় আমগাছ । আমিসহ সবাই এটার আড়ালে উৎ পেতে রয়েছি । দূরপাল্লার বাসটি এদিকেই আসছে । রাস্তার ঝোপের অদূরেই একটা শিয়াল লাগাতার হুক্কা-হুয়া ডেকেই চলেছে । হয়তো সে যাত্রীবাহী বাসের ড্রাইভারকে সতর্ক করার জন্য বারবার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । আমার খুব রাগ হচ্ছিল শিয়ালটির প্রতি। ইচ্ছে করছিলো এখনই ওটার উপরই গিয়ে বিস্ফোরিত হই ।
বাসে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমায় আগুণ ধরে যায়
বাসে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমায় আগুণ ধরে যায়

না আমি শুধু শুধুই দুঃশ্চিন্তা করছিলাম । বাসটা এখন একেবারেই আমাদের সামনে । আমি বুঝে উঠার আগেই কে যেনো পিছন দিকে আমাকে জোড়ে বাসটিকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলো । কখন যে মনিব আমার সলতেতে আগুণ লাগিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিলো, বুঝতেই পারিনি । আমি আজ চরম ক্ষ্রিপ্ত, চরম উন্মাদ ! আমার সলতেতে দ্রোহের আগুণ লেগেছে !  কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরিত!  আমি অহংকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ক্ষণিকের মধ্যেই এক গগনবিদারী আর্তনাদের সৃষ্টি করি । আমি একা নই, আমার সাথে আরো অনেকগুলো পেট্রোল বোমা ঝাঁপিয়ে পড়লো শিকারের উপর, ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়াবতী হরিণের উপর । আমাদের ধ্বংসাত্মক নৃ-উল্লাসে চরমভাবে শিকার হলো যাত্রীসমেত সমস্ত বাস । বাসের ভিতরে-বাইরে নিমিষেই আগুণ ধরে গিয়েছে । আমি সর্বশেষ পড়লাম গিয়ে ঐ সিটটাতে যেখানে  স্বামী-স্ত্রী তাদের পাঁচ বছরের আদরের সন্তানটিকে নিয়ে দুটো সিটে পাশাপাশি বসে ঘুমোচ্ছিলো । বেচারা, দুজনই হয়তো ঘুমের ঘোরে বুঁদ হয়ে আছে । বাচ্চাটি কী ফুটফুটে সুন্দরই না দেখতে । ঐ মূহুর্তে আমার পাষাণ মনটাও চাইছিলোনা ওদের উপর গিয়ে পড়ি । কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে । ভাবতে ভাবতেই আমি ঠিক তাদের মাঝখানে পড়লাম । মুহুর্তেই টুকরো টুকরো মাংসগুলো এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো । আমার নাকে তখন দগ্ধ পোড়া মাংসের গন্ধ ছাড়া আর কিছুই আসছিলোনা । আমি চমকে গেলাম ! আচ্ছা, একটু আগেই না এখানে একটা ফুটফুটে শিশু অতি নিশ্চিন্তে তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আগামীর স্বপ্ন দেখছিলো আর তার পাশে তার মা  স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলো? ওরা কোথায়? আমি বাসের ভিতরে তাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে যা দেখলাম তার জন্য শুধু আমি কেনো, পৃথিবীর কেউই প্রস্তুত থাকবেনা । দশ-বারোজনকে চেনাই যাচ্ছে না, এর মানুষ নাকি অন্য কোনো প্রাণী ! অনেকক্ষণ পরে কে যেনো চিৎকার দিয়ে উঠলো, “ভাইয়া রে, আমাদের এ কি হয়ে গেলো রে !” এতোক্ষণ ধরে কেউ টু শব্দটুকুন পর্যন্ত করেনি । আসলে সবাই শ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিলো । অর্ধনগ্ন ঝলসে যাওয়া এক তরুণীর এই চিৎকারের পরপরই হঠাৎ করে অনেকগুলো গগনবিদারী আর্তনাদের সৃষ্টি হলো- আল্লাহ !  গভীর রাতে এ আর্তনাদ সাত আসমান ভেদ করে দ্বিগুণ-তিনগুণ প্রতিধ্বনিত হয়ে বার বার ফিরে আসছে । বেশিক্ষণ লাগলোনা, পাশ্ববর্তী গ্রামের শতশত মানুষ এসে জড়ো হয়েছে । গ্রামবাসীদের কেউ এই দগ্ধ,  মৃত-অর্ধমৃত মানুষগুলো কাছের বা দূরসম্পর্কের আত্মীয় নয় । তবু কেউ চোখের জল আটকিয়ে রাখতে পারেনি । শোকের মাতমে চারদিকটায় থমথম হয়ে গেলো । অথচ অ্যাম্বুলেন্সের হর্ণ, মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার, আফসোস, ধিক্কার সমানতালে চলছিলো । কে যেনো ডুকরে কেঁদে বললো, “আল্লাহয় জানে, কার বুক খালি করলো ! আহারে, এই মানুষটার দুই চোখই পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে । নাক-মুখ কিছুই  বুঝা যাচ্ছেনা । আর ঐ যে ঐ মহিলার হাড়-মাংস সব পুড়ে ঝলসে গেছে !” বাসের ওপাশে একজন মধ্যবয়সের লোক চিৎকার দিযে উঠেছে, “অ্যাম্বুলেন্স এদিকে নিয়ে আসো, এই লোকটা মনে হয় আর হাসপাতালে যেতে পারবেনা ! হায় আল্লাহ, মানুষগুলো এতো নিষ্ঠুর হয় কেমনে?” এতোক্ষণে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম- আমি আর সেই সলতে ভরা সুন্দর বোতলে নেই । বোতলের টুকরা যেখানে সেখানে পড়ে আছে । আমি আর আমাতে নেই, বাসের ভিতরে-বাইরে, যেখানে সেখানে লেপ্টে আছে পেট্রোল । আরো দেখলাম, যে মানুষগুলো পুড়ে ঝলসে গিয়েছে তাদের শরীর ভেদ করে আমি তাদের হাড় স্পর্শ করে ফেলেছি । ঝলসে যাওয়া মাংসে পেট্রোল আর পোড়ার গন্ধ সমানতালে ছড়িয়ে যাচ্ছিলো ।
পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া মা ও শিশু
পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া মা ও শিশু

ভোর হতে না হতেই একে একে বাসের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো নিকটস্থ হাসপাতালে । যেতে যেতে অনেকেই চলে গেলো ওপারে । আর যারা কোনো রকম বেঁচে ছিলো তাদেরকে নেয়া হলো বার্ণ ইউনিটে । অবস্থা খুব ভয়াবহ । শুধু আমি রইলাম বাসের সিটে, মানুষের মাংসে লেপ্টে। ঘটনাস্থলে আমার আয়ু শেষের দিকে চলে আসছে । আমি ক্রমশ ঝাপসা দেখছি । তবে মাথাটায় বেশ ঝিম ধরেছে ।  ঐ শিশুটা কি বেঁচে আছে? নাহ, কিছু ভাবতে পারছিনা । আমি বুঝতে পারছি আমি মৃত্যুর দিকে অগ্রসর মান । মৃত্যুর আগে পূর্বজনমের কথা মনে পড়ছে । ঐ যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটা বাসের দিকে লক্ষ্য করে আমাকে দুর্বৃত্তরা ছুঁড়ে মেরেছিলো । হ্যা, এইতো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেই বাসে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া যশোরের নুরুজ্জামান পপলু ও তাঁর মেয়ে মাইশা তাসনিমকে, তাসনিমের মা মিতা মাহফুজা কোনে রকম বাস থেকে লাফিয়ে বেঁচে গিয়েছিলো  । ঐতো দেখা যাচ্ছে কক্সবাজারের আবু তাহের, আবু ইউসুফকে, নরসিংদীর আসমা বেগম ও তাঁর ছেলে শান্তকে । ঢাকার ওয়াসিমের ঝলসে যাওয়া লাশটাও আজ খুব স্পষ্ট  দেখাচ্ছে।

বরিশালের সোহাগের অঙ্গার দেহটি দেখে আমি নিজেও চমকে যাচ্ছি । ট্রাকের হেলপার ছিলো । বেচারা পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিলো । মাগুরার রাস্তা ধরে যাওয়া একটা ট্রাকে আমার বিস্ফোরণে মৃত শ্রমজীবি রওশন বিশ্বাস, তাঁর ভাতিজা মতিন বিশ্বাস, শাকিল মোল্লা । মতিনের জীবনকাহিনীটা কি আপনাদের জানা আছে? মতিন ও তাঁর স্ত্রী রাহেদা বেগম বেশ সুখে শান্তিতেই দিন কাটাচ্ছিলেন । একসময় তাঁদের যমজ সন্তান হয় ।  অতি আদর করে নাম রাখেন- নিহা, নিশাদ  । দুজনের বয়স ৫ বছর । মতিন বিশ্বাসের মারা যাওয়ার ৯ মাস আগে আরেকটা সন্তান হয় । নাম নিরব । সোনার সাজানো  সংসারটুুকু একনিমিষেই ভেঙ্গে চুরমার ।  চাঁদপুরের ট্রাক মালিক খন্দকার শরীফ উদ্দিন যে কিনা দুর্বৃত্তদের ছুঁড়া পেট্রোল বোমায় নিজের ট্রাকেই পুড়ে মরেছে আজকে তাদের মুখচ্ছবি আমাকে তাড়া করছে ।
আচ্ছা আজকে আমি তাড়াতাড়ি মরছিনা কেনো? একের পর এক কষ্ট দিয়ে চলেছে । এর আগে পৃথিবীর অন্য দেশে আমি মৃত্যুর আগে এমনটি দেখিনি, আমার চোখে এমনটি ভাসেনি । আজ চোখে ভেসে চলেছে একের পর এক পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ । কারণ এ পর্যন্ত পেট্রোল বোমায় যে ৭৪ জন মারা গিয়েছে তাদের সবাই সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষ । 
পেট্রোল বোমায় মৃতদের আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি আর অভিশাপ
পেট্রোল বোমায় মৃতদের আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি আর অভিশাপ
হে কাপুরুষের দল, হে অনাচারী, হে ভন্ড প্রতারক, ধর্মের ধ্বজাধারী, তুমি কি এখনো শুনোনি মাগুরার রকিব বিশ্বাসের অভিশপ্তবাণী, যাঁর ভাই রওশন আলী তোমার ছুঁড়া পেট্রোল বোমায় পরপারে চলে গিয়েছে? যারা তোমার দেয়া পেট্রোল বোমায় মারা গিয়েছে, পঙ্গু অবস্থায় অসহনীয় জীবনযাত্রা করছে তাঁদের আর তাঁদের আত্মীয় স্বজনের সবার মুখে আজ শুধু রকিবের মতো অভিশাপবাণী শোভা পায়, “আমরা তো ভাই রাজনীতি করি নে । তাইলে আমাগের ক্যান পুড়ে মরতি হবি? যারা রাজনীতি করে তাগের সাথে দ্বন্দ্ব না করে আমাগের মতো গরিবগেরে ক্যান পুড়ায়ে মারতিছে? আল্লা তাগের ওপর এহনো গজব দেয় না ক্যান?”

এই সেই রাস্তা, যেখানে আমাকে নিক্ষিপ্ত করে পালিয়েছিলো কাপুরুষ মনিব । যে আমাকে তার ভাষণে উত্তেজিত করে বলেছিলো, আমার বিস্ফোরণ নাকি বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্র ত্যাগ !  হায় রে কাপুরুষ, চন্ডাল, পাষন্ড, নির্দয়, অমানুষ ! যে একটা ফুটফুটে শিশুর শরীর ঝলসে দিয়ে মেরে ফেলতে এতোটুকুনও গ্লানিবোধ করেনা, একের পর এক সাজানো সংসারগুলো নষ্ট করতে যার হাত এতোটুকুনও কাঁপেনা, সে ক্ষমতায় গেলে মানুষের জন্য কী করবে তা আজ পরিষ্কার । আফসোস ! একটু আগে যদি আমি এটা বুঝতাম । বুঝেই বা কী করবো ! আমার যে প্রাণ নেই, আমি নিষ্প্রাণ পেট্রোল বোমা । আমাকে যে যেভাবে ব্যবহার করে সেভাবেই ব্যবহৃত হই । আমি তো নিজে থেকে পেট্রোল বোমা হইনি । আমার শরীর আজ থরথর করে কাঁপছে ভয়ে, না জানি মহান স্রষ্টা আমার প্রতি রাগান্বিত !

হে শান্তিকামী মানবজাতি, আমি পেট্রোল বোমার জীবন চাইনা । আমি ফিরে যেতে চাই আমার চিরায়ত, মানবতার কল্যাণমূলক কর্মকান্ডে । আমি পেট্রোল বোমা হয়ে বারবার জন্ম নিতে চাই না । আমাকে তোমরা সৃষ্টি করোনা । আমি যে পাপের ভার আর বইতে পারছিনা । আমি আজ ভীত অভিশাপ, ঘৃণায় ।

লেখক,
ইলিয়াস আহমেদ

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাঃ ভর্তিযুদ্ধ, র‌্যাগিং, বিশ্ববিদ্যালয় ও সার্টিফিকেট উপাখ্যান



মস্তিষ্কের নিউরনের সর্বোচ্চ ব্যবহারে, অজানা শঙ্কার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে, পৃথিবীর তাবৎ চিন্তার বোঝা একটা মাথায় নিয়ে, কেবলমাত্র পারিবারিক ও শুভাকাঙ্খীর স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে দিনরাত অমানুষের মতো পরিশ্রম করে, অসম-বন্ধুর-কণ্টকময় প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে নিজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আসন অর্জন করা কতটা যে কঠিন তা কেবল মাত্র ঐ ভুক্তভোগী ছাত্রটিই জানে ।

যখন সে কাঙ্খিত অর্জন করে ফেলে তখনই সে তার সমসাময়িক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম, অসীম শঙ্কা-ভয়-দুঃশ্চিন্তাকে অতীত ভাবতে শুরু করে এবং সব ঝেড়ে ফেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । নব উদ্যমে বাঁচতে শুরু করে, স্বপ্ন দেখে নতুন আগামীর । কিন্তু সে তো জানে না, সে কেবল প্রতিযোগিতার সিঁড়িতে পা রাখলো, তার জন্য উন্মোচিত হলো বিশাল প্রতিযোগিতার আসর! সে জানে না, কৃষকের স্বপ্নাতুর সন্তানকে নিয়ে এখন বিশ্ব তার মতো করে খেলবে, তার কাছে মজা লুটবে, প্রয়োজনে তার হাত-পা কেটে, রগ কেটে, চোখ উপড়ে নিয়ে ভৌতিক মঞ্চে তাকে ভূত সাজাবে! সেতো জানে না রাজনীতির ছেলেরা তার কাছে ফায়দা লুটবে, ক্ষমতাধরেরা তাদের ইচ্ছেমতো নাচাবে, । সেতো জানে না, ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়েরা একটা রুমে তাকে নিয়ে গিয়ে সারারাত হৈ হুল্লোর করবে, শার্ট-স্যন্ডোগেঞ্জি খোলার পর প্যান্ট খুলতেও বাধ্য করবে, শালীন-অশালীন বাক্যে মানসিক ও শারীরিকভাবে যতোটা পারা যায় জর্জরিত করবে, দেশে এমনো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে প্রয়োজনে যৌনচারে বাধ্য করবে । যখন সে এমন পরিস্থিতির শিকার হবে, সবই দেখবে এবং হায়েনাদের দ্বারা শিকার হবে, তখন কিছুই করার নেই । জোরপূর্বক সম্মানগ্রহীতা বড় ভাই শ্রেণিটি হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে কিংবা হোটেলে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করবে । এ যেনো সারারাতের পরিশ্রমের প্রাপ্যমূল্য! তখন ঐ ছাত্রটির কাছে যৌনপল্লীর পতিতাদের অবস্থান ভালো মনে হবে । কারণ, আর যাইহোক, অন্ততঃ পতিতারাতো ধর্ষনের শিকার হয় না । মানসিক ও শারীরিকভাবে কতটা নির্যাতিত হলে একটা ছাত্র নিজেকে ধর্ষিত ভাবতে পারে? সেই রাতটি ঐ ছাত্রটির জন্যে জীবনের অন্যতম কালো রাত । বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে, হল কিংবা মেসের দেয়াল ভেঙ্গে শব্দেতর বীণার সুর ছেদিত হয়ে অজানায় যাত্রা করে । কান্নায় ভেসে আসে আপনজনের মুখ । তারা যদি তাদের সন্তানের এই অবস্থা দেখে, তবে কি সইতে পারবে? আদরের ছোট বোনটি অথবা ভাইটি যদি তার ভার্সিটি পড়ুয়া ভাই অথবা বোনের এমুহুর্তের ধর্ষিত মুখটি দেখে, তাদের অবস্থা কী হবে? চোখের জলের একেকটা ফোঁটার সাথে হৃদয় থেকে নির্গমন হয় একেকটা স্বপ্ন, যে স্বপ্নগুলো বাঁধতে সময় নিয়েছে দীর্ঘ তেরো থেকে চৌদ্দটা বছর । মাত্র একটা রাতই তাকে এতোটা ভেঙ্গে দিয়েছে! শিক্ষাসিরিজের গল্পগুলো এখানেই শেষ হলেও বেঁচে যেতো আগামী প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ, কিন্তু চেইন অব সিস্টেমে আরো রয়েছে অনেকগুলো লেভেল । সেসব লেভেলে অন্তত ধর্ষিত হতে হয় না, তবে নিজেকে দিনে দিনে অপরাধী, অসহায়, পরিবারের উপর বোঝা ইত্যাদি মনে হয় । হয়তো সেই ধর্ষিত ছেলেটিও বছর যেতেই একরাতে কয়েকজন বন্ধুদের সাথে নিয়ে কোনো এক সদ্য চান্সপ্রাপ্ত ছাত্রকে বলবে, “বড় ভাইদের দেখলে সালাম দিস না কেনো? কান ধর! উঠবস কর! বুকডাউন দে! প্যান্ট খোল..!”

ভর্তিযুদ্ধ, র‌্যাগিং, বিশ্ববিদ্যালয়
সভ্যতার সভ্যতা- র‌্যাগিং
মনে আছে কি সেই ছাত্রটির কথা, যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পায় নি? তাদের কথা কি মনে আছে যারা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে নি? তারা অসমাপ্ত উপাখ্যানের চরিত্রে নিজেকে জড়িয়ে অনেকেই ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে, সবার কাছে তখন খ্যাতি ছেলেটিও ঠুনকো মনে হয় । এসময় নিন্দুকেরা বেশ সুযোগ পেয়ে যায় । পরিবার-পরিজন আর শুভাকাঙ্খীরা নিথর হয়ে এক ব্যর্থ সৈনিকের নির্বাক ঠোঁট আর অপলক-লাজুক চোখের দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকে । ব্যর্থ সৈনিক শুধু নিজেকে নিজের মাঝে গুটাতে থাকে । গুটাতে থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কেউ কেউ চিরনিদ্রা পর্যন্ত । তবুও কেউ কেউ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে । কিন্তু তাদের এ স্বপ্ন হোঁচট খায় কিছুদূর হেঁটে যাবার পর । প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যে ব্যতিক্রম ব্যতীত প্রায় সবারই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । অবশ্য এই বৈষম্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়েও রয়েছে । কে বলেছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধনী-গরীবের অন্ততপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো বৈষম্য নেই! স্কুল-মাদ্রাসা, প্রাইভেট-পাবলিক, বাংলা-ইংরেজি মিডিয়াম, ক্যাডেট-ক্যান্টনমেন্ট, গভঃ উচ্চবিদ্যালয়-উচ্চবিদ্যালয, প্রাইমারী-কিন্ডারগার্ডেন এসব কী? এখানেই কি থেমে গেছে! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, যেখান থেকে আগামীর নেতৃত্বের কর্ণধারেরা বের হবে, সেই স্বায়ত্ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পর সাপে-নেউলে অবস্থান, সুযোগ-সুবিধাসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে পরস্পর বিপরীতমুখী ও বৈষম্যমূলক । চাকরির ক্ষেত্রেও স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রভাব রয়েছে বটে । একই দেশের মাটিতে পড়ালেখা করে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার আমরা । গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষাব্যস্থায় এ কোন ধরণের গণতন্ত্রের ‍উদারতা, তা ভুক্তভোগীদের কাছে বড়ই রহস্যময়!

এতো গেলো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যের কিঞ্চিত কথা । আমরা একরকম ভুলেই গিয়েছি যে, একসময় এদেশের বড় বড় নাতুবাবু-ছাতুবাবুর ছেলেরা গুরুগৃহে কিংবা পাঠশালায় গিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যেতো । আর মেয়েরা অন্দরমহলে । তখনকার জ্ঞানার্জন আজকের মতো আধুনিকায়ন না হওয়ায় তা সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ ছিলো না! তাই তখনকার শিক্ষাব্যবস্থায় যে যতো বড় জ্ঞানী ছিলো, তার অহংকার ততোই কম ছিলো, উদারতা ছিলো ততই বেশি । ‘শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হওয়া’ কথাটি তখনকার দিনের জন্য প্রযোজ্য । অথচ মূর্খতার কারণে আমরা তা আজকের দিনেও অপপ্রয়োগ করছি ।
এরা ছাত্র নাকি সন্ত্রাস? ছবিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোলা


বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে ছাত্র পরীক্ষার খাতায় ‘শ্রমের মর্যাদা’ রচনা লিখতে গিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কাগজ ফুরায়, সেই কিনা স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করার পর শিক্ষিত কৃষক হতে লজ্জা পায়, হকারি করতে লজ্জা পায়, কম মাইনের কাজ করতে লজ্জা পায়, ওয়ার্কশপের কালি তার কাছে তখন ঘৃণার বস্তু হয়, কলকারখানার ধোঁয়া তার কাছে মান হানিকরের বিষয়! অদ্ভূতের বিষয় নয় এটা । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এরচেয়ে বেশি শেখাতে পারেনি আমাদেরকে । বড় বড় ডিগ্রীর চাপায় তখন প্লেটো-এরিস্টটল, ইউক্লিড, পীথাগোরাসের শিক্ষা হারিয়ে যায় । সার্টিফিকেটের ঔদ্ধতায় হারিয়ে যায় ডঃ লুতফর রহমানের উন্নতজীবন, মহৎজীবনের শিক্ষা, তলিয়ে যায় সিস্টেমের অথৈ সাগরে । তাই দোষ কোনো ছাত্রের নেই, দোষ নেই কোনো শিক্ষকের । কারণ আজকের ছাত্রইতো আগামী দিনের শিক্ষক । এ শিক্ষাব্যবস্থায় থেকে যা হয়েছে তা হলো, কাগজে-কলমে এক রূপ আর বাস্তবিক ক্ষেত্রে তার বিপরীত রূপ ।
তাহলে এই পরস্পর বিরোধী ও প্রতারণাময় শিক্ষাব্যবস্থার কাছে আমরা কেনো সোনার ছেলেমেয়েদের আশা করি? সার্বিক চিন্তাসাপেক্ষে তাদের উপর কি এটা জুলুম নয়? আর যারা মনে করছেন প্রতিবছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সোনার ছেলেমেয়েরা বের হচ্ছে, তারা বিবেকের কষ্টিপাথর দিয়ে কি ঘঁষে দেখেছেন আসলে সোনার না সেমিগোল্ড? এখনো সময় আছে ভয়ংকর প্রতারণাময় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচানোর । নতুবা খুব বেশিদূর নয়, যেদিন চতুষ্পদ প্রাণীগুলোও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় জমাবে একটা ডিগ্রী নেয়ার জন্য, যেদিন বিশ্বখ্যাত এনকাউন্টার-টেরোরিস্ট তৈরি করার জন্য বিভিন্ন কোর্স চালু হবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেদিন কেবলমাত্র শিক্ষিত হওয়ার কারণে দেশে সৃষ্টি হবে আরেকটা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’!




লেখক-
ইলিয়াস আহমেদ

আমি মানুষ হইবো কেনো?


শৈশব হইতে আজ অবধি মোর শিক্ষাগ্রহণের পেছনেই পিতার খরচ হইয়াছে কাড়ি কাড়ি টাকা। প্রাথমিক বিদ্যালয় হইতে বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও আমাকে অর্থ ব্যতীত পরীক্ষার হলে ঢুকিতে দেয় নাই। পাস করিবার মতো জ্ঞান অর্জন হইলেও কেবল টাকার জন্য উপর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হইতে পারি নাই। জ্ঞান প্রদান করিবার পূর্বে সকলেই আমার দরিদ্র পিতার অর্থ-কষ্ট আরও বাড়াইয়া দিয়াছে। চাকুরী পাইবার আগ পর্যন্ত আমার পড়ালেখার জন্য এক পর্বতসম অর্থ ব্যয় করিতে হইয়াছে। তার উপর এর দ্বিগুণ-তিনগুণ শুভেচ্ছামূল্য (কে যেনো বলিয়াছিল ইহার নাম ঘুষ, উৎ কোচ) প্রদান করিয়াই চাকুরীর এই আসন অলংকৃত করিয়াছি। আমাকে তো শিক্ষার পিছনে এত (ঠিক কতো টাকা তার হিসাব নাই) টাকা ব্যয় করিতে হইয়াছে। সেই আমি কেন দুর্নীতি করিব না? না খাইয়া মরিব নাকি? বিনা টাকায় মানবসেবা করিতে গেলে কি আর পেটে ভাত পড়িবে? লক্ষ-কোটি টাকা ব্যয় করিয়াছি ডাক্তার হইবার জন্য। মেডিকেল কলেজে টাকার ব্যাপারে কেহ এতটুকুনও ছাড় দেয় নাই। পিতার জমি বিক্রি করিয়াছি। দামি দামি বই, প্র্যাক্টিকাল সেট, বোন সেট, ল্যাপটপ আর কয়েক মাস পর পর অ্যাপ্রন ক্রয় করিবার জন্য কত যে অর্থব্যয়
করিতে হইয়াছে তাহার কোনো হিসাব মিলিবে না। এতসব কাঠখড় পোড়াইয়া তবেই না আমি বড় ডিগ্রিধারী চিকিৎসক হইয়াছি। পিতা আর শুভাকাঙ্খী আত্মীয়- স্বজনেরা স্বচক্ষে দেখিয়া আসিতেছে ‘চিকিৎসা সেবা’
ব্যবসাটি বর্তমান সময়ে বিশেষ লাভজনক আবার সম্মান জনকও বটে। সেই দিকটা বিবেচনা করিয়াই আমার পেছনে দু’হাত ভরে খরচ করিয়া তাঁহারা আজ একেবারে নিঃস্ব হইয়া আসিয়াছে। আমি ইবনে সিনা নই, হাজী মোহাম্মদ মহসীনও নই। আগে পিতার টাকার ঝুলিটা পূরণ করিতে হইবে অতঃপর নিজেরটা। তারপরেই না হয় ভাবিব কী করিয়া বিনামূল্যে চিকিৎসায় মানবসেবা করা যায়! সেই জন্যইতো সরকারি হাসপাতালের
চাইতে ক্লিনিকের, বিনা পয়সার রোগীদের চাইতে পার্সোনাল চেম্বারের রোগীদের কদর বেশি। ইহা না করিতে পারিলে কী আর এতদিনের আশা আকাক্সক্ষা পূরণ করিতে পারিব? জমি বিক্রি করিয়াছি, ব্যাংক থেকে চড়াসুদে ঋণ লইয়াছি, অতঃপর নির্বাচনের প্রচারণা চালাইয়াছি। পাড়ায়-মহল্লায় নিজের পদপ্রার্থিতা উপলক্ষ্যে মিছিল-মিটিং-এর ব্যবস্থা করিয়াছি। নির্বাচনে জয় পাবার নিমিত্ত আমি কোটি কোটি টাকা ক্ষয় করিয়াছি।
তা না হলে কেহ যে আমাকে ভোট দিয়া জয়যুক্ত করিবে না, তা আমি যতই সৎ হই না কেন। দিনের পর দিন ভাষণে বলিয়াছি, ‘সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা, আমাকে জয়যুক্ত করিলে আপনাদের সেবা করিয়া কৃতার্থ হইব’ আর রাতের আঁধারে বড় বড় নোট দেখাইয়া ভোট কিনিয়াছি। নূতন পাঁচশ’ টাকার নোট দেখিয়া তোমাদিগরও জিহ্বা লোভে লক লক করিয়া ছিল। আমাকে বোকা পাইয়াছ? দুর্নীতি করিয়া লাভসহ মূলধন উঠাইব না- তো কী করিব? ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেইদিন হইতে যাতায়াত শুরু করিয়াছিলাম, সেইদিনই ধর্মীয় ওস্তাদ (!) আমাকে শিখাইয়াছেন কী করিয়া ধর্মের বাণী শুনাইয়া লোকের নিকট হইতে টাকা খসাইতে হয়। তিনি আমাকে ইহা শিখান নাই ধর্মের বিনিময়ে অর্থগ্রহণ করিলে ইহা আর ধর্মীয় কাজ থাকে না, হইয়া যায় ধর্মব্যবসা। রুজি-রোজগারের ব্যাপারে ধর্মব্যবসা ব্যতীত বিকল্প যে কোনো উত্তম ব্যবস্থা থাকিতে পারে ইহা তো আমাকে শেখানো হয় নাই। কোনো ওস্তাদই (!) আমাদিগকে ইহা ভুলক্রমেও শিখান নাই যে ধর্মের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য শুধুমাত্র মানব কল্যাণ। তিনি স্বপ্ন দেখাইয়াছেন মসজিদের ইমাম হইয়া, নামায পড়াইয়া, মিলাদ পড়াইয়া, জানাজা পড়াইয়া, ধর্মের কাজ করিয়া কীভাবে সংসার চালাইতে হয়। কী করিয়া ওয়াজ করিলে হাজরো মানুষের চোখ ভিজিয়া যায় আর পকেট উজার করিয়া তাহারা অর্থ প্রদান করে তাহা অতি উত্তমরূপে শিখিয়াছি। এখন আপনরাই বলুন, ধর্মের বিনিময়ে আমি টাকা লইব না- তো করিবটা কী? আজিকার দিনে শিক্ষা, চিকিৎসা, শাসন, ধর্ম ইত্যাদি কোনো বিষয়ই আর সেবা বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে না। আর যেথায় নিঃস্বার্থ সেবা পেশায় পরিণত হয় সেথায় আমি মানুষ হইব কেন? আমি শান্তির আশা করিব কেন? আমার কথা তো অনেক শুনাইলাম। শেষ করিবার. পূর্বে সক্রেটিসের একটি বানী শুনাইব। তিনি একদা বলিয়াছিলেন, ‘অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা অর্জনের চাইতে অশিক্ষিত. থাকাই উত্তম’।
কসম স্রষ্টার! কঠিন হিসেব তোমাদিগের দিতে হইবে, যে হিসেব দিতে হইবে না একজন বর্গাচাষী কৃষকের, কুলিমজুরের বা ওই দিনমজুরের।

লেখক
ইলিয়াস আহমেদ

আমি মফিজ কিংবা ভাটিয়া নই, আমি এলিয়েন



জন্মের পর পরই প্রতিটা মানবশিশু পৃথিবী সাপেক্ষে একেকটা এলিয়েন বা আগন্তুক । সহজ ভাষায় বলতে গেলে মেহমান । এলিয়েন এ কারণেই সে এই অদ্ভূত পৃথিবীতে এসে প্রথমে কিছুই ঠাওর করতে পারেনা । সে কারণেই কি জন্মের পর পর মানবশিশু চিৎকার দিয়ে কান্না করে? হয়তো । ধীরে ধীরে যখন পৃথিবীর পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে থাকে এরপর থেকে আর সে এলিয়েন থাকেনা, তখন সে পৃথিবী নামক গ্রহেরই একজন প্রতিনিধি । এটা আমার তত্ত্ব । 

অন্তঃপুরের ত্রিসীমানা পেরিয়ে যেদিন থেকে বাইরের জগতে যেতে মানবশিশুর ইচ্ছে জাগলো সেদিন সে বেরিয়ে দেখলো তার মতো আরো অনেক মানবশিশু বাইরে খেলা করছে । কেউ বালু দিয়ে ঘর বানাচ্ছে, কেউ প্লাস্টিকের গাড়ি চালাচ্ছে । একেকটা মানবশিশু একেকটা খেলায় মত্ত । ইস্ ! এরা কত সহজে পৃথিবীটাকে আপন করে নিয়েছে ! এরা বোকা নাকি? আমরা যে এলিয়েন, এটা এতো সহজে কী করে ভুলে গেলো?

প্রথম দুই তিনদিন হয়তো আমি ওদের সাথে মিশতে যাইনি । তারপর পরের দিন খেলায় মত্ত মানবশিশুর মধ্য থেকে কে যেনো আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলো । আমি বেশ সংকোচ নিয়ে কাছে গেলাম । সে বললো, আমার গাড়িটা একটু ঠেলে দাওতো । 

তার কথা শুনে আমার মনে মনে খুব হাসি পাচ্ছিলো । কারণ ওটা ঠেলে দেয়া লাগেনা । টোকা দিলেই যেটা কয়েকমাইল গিয়ে পড়বে সেটাতে ঠেলে দেয়া আর ঝড়ের দিনে ফুঁ দেয়া একই কথা । কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমি হাসলামনা । কারণ আমি জানি, সে আমাকে তার খেলার সাথী হওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ওটা বলেছে । আমিও বেশ আগ্রহের সাথে গাড়িটা ঠেলে দিলাম । এই প্রথম গাড়িটা হাত লাগার সাথে সাথে পৃথিবী আমাকে তার প্রতিনিধি বানিয়ে নিলো আর আমি তাকে স্বাগতম জানালাম । 

এভাবে বেশ চলে যাচ্ছিলো আমার প্রতিটি দিন । কয়েকবছর যেতেই সেই খেলার সাথীদের কে যেনো বললো,
তুই তো স্থানীয় না ! 

এতোক্ষণ বেশ মনোযোগসহকারেই খেলছিলাম । কথাটা শোনার পর হঠাৎ করেই তার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম । আমার এই তাকানোতে সে বুঝতে পারছিলো আমি স্থানীয় শব্দটির সাথে মোটেই পরিচিত নই । তাই তারা আমাকে বুঝালো, যারা ঠাকুরগাওয়ে আগে থেকেই আছে তারাই স্থানীয় আর যারা অন্য জায়গা থেকে এসেছে তারা সবাই বহিরাগত বা অস্থানীয় । আমরা স্থানীয় ।
লক্ষ্য করলাম, যখন সে বললো, ‘আমরা স্থানীয়’ তখন সে বেশ বুক ফুলিয়ে কথাটা বলছিলো । আমি বুঝলাম না, এখানে বুক ফুলানোর কী আছে । ভাবলাম কী বোকাই না ওরা ! একে তো সবগুলোই এলিয়েন, তার উপর কিছুদিন পর সবাই নিজ গ্রহে ফিরে যাবে । আর এরই মাঝে পরভূমে এসে সৃষ্টি করেছে স্থানীয়-অস্থানীয় শ্রেণীভেদ । কিন্তু এ বুক ফুলানোতে যে যৌক্তিকতা আছে তার প্রমাণ পেলাম কলেজ, ভার্সিটি পড়ার জন্য যখন বাইরে থাকতে হলো তখন ।
বেশিদিন গেলোনা, খেলার সাথীদের কাছ থেকে আমি নিজেকে সত্যি সত্যিই ছাড়িয়ে নিলাম । কারণ আমি এলিয়েন হয়েই থাকতে চাই । এই প্রথম পাড়ার ছেলেমেয়েদের থেকে আমি বহুদূরে যেতে থাকি । আজ যেটা একেবারেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে । 

মাধ্যমিক পাস করার পর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে ভর্তি হই । যার কারণে দুইজন বন্ধুসহ শহরের একটা মেসে উঠি । মেসে উঠার কিছুদিন পর লক্ষ্য করলাম, এখানকার কয়েকজন অনার্স পড়ুয়া বড় ভাই ও সহপাঠীরা আমাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে । কারণটা জানতে চাইলে পরে তাদের সাথে সরাসরি কথা বলে যেটা শুনলাম তার জন্য একেবারেই প্রস্তত ছিলাম না । আমার ঐ সহপাঠী বললো, ‘তোরা তো ভাটিয়া’ । আমি তখনো জানতাম না ভাটিয়া কি জিনিস । তাই তার দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকলাম, যেভাবে তাকিয়ে ছিলাম সেই শৈশবে সেই খেলার সাথীদের দিকে ।
পরে আমার সেই বন্ধুদের কাছে এসে জানতে পারলাম আমাদেরকে কেনো ভাটিয়া বলে । যারা বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে এসে বৃহত্তর দিনাজপুরে বাস করছে তারা সবাই ভাটিয়া । ভাটিয়া শব্দটির সাথে ভাটা শব্দটির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত । যাক নতুন একটা পদবী কপালে জুটলো । এরপর থেকে প্রায় এখনও এই শব্দটা কানে আসে । খারাপ লাগলেও শুনতে হয় । কিন্তু আশ্চর্য্য না হয়ে পারিনি সেদিন । কেনোনা আমার খেলার সাথীরা না হয় না বুঝেই সেদিন আমাকে স্থানীয়-অস্থানীয় মানদন্ডে ফেলে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো । কিন্তু অনার্সপড়ুয়া ভাইগুলো কী করে পারলো !  

সহপাঠীকে আরো জিজ্ঞেস করেছিলাম কেনো তারা আমাদেরকে দেখতে পারেনা । সে উত্তরটাও যথাযথভাবেই দিয়েছিলো । ভাটিয়ারা চড়া গলায় কথা বলে, উগ্র মন মেজাজ ইত্যাদি ।
তার কথার যৌক্তিকতা যে ছিলোনা তা নয়, ঠাকুরগাঁওয়ে যেসব বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে আগত মানুষ ও পরবর্তী প্রজন্ম, তাদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য । কিন্তু এটাও বিবেচ্য যে, স্থানীয়দের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষরই যে মনমেজাজে ভালো, এমনটিও তো না । এটা শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বাংলাদেশের প্রতিটা জেলা, পৃথিবীর প্রতিটা দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য । এটা কখনই সম্ভব নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের মনমেজাজ, আচার-আচরণ-সংস্কৃতি একই রকম হবে । অঞ্চলভেদে বৈচিত্র্যতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক । মানবিক মৌলিকতা ব্যতীত অঞ্চলভিত্তিক বৈচিত্র্যতাকে যখন সত্য-মিথ্যার মানদন্ডে মাপার চেষ্টা করা হয় তখন থেকেই সৃষ্টি হয় বৈষম্য-বিভেদ । সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে খারাপ প্রকৃতির লোক সে সর্বত্রই পরিত্যাজ্য, ঘৃণিত । তার এই দুষ্টাচারে কেনো স্বগোত্রের নির্দোষ ব্যক্তিটি দোষী হবে? কেনো তার অপরাধের সমস্ত দায়ভার নির্দোষীর উপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে কষ্ট দিতে হবে? যদি এমনই হয় তোমার দৃষ্টিভঙ্গি তবে তুমি কী করে নিজেকে দেবতুল্য ভাবো?

ভাটিয়া সম্পর্কে আমার এতোদিন এতোটুকুনই ধারণা ছিলো । বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর একটা সহপাঠীর কথা শোনার পর আরো আশ্চর্য্য হলাম একারণে যে, সে তো হিন্দুধর্মাবলম্বী । তাকে কেনো ভাটিয়া বলা হয় ! বোধহয় সেও আমার মতোই…

আমার বাবার পৈত্রিক ভিটা ছিলো ময়মনসিংহ জেলায় । আশির দশকে গৃহস্থ জমিজমা-পুকুর সব রেখে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসমেত দাদা ঠাকুরগাঁওয়ে পাড়ি জমায় । এখানে এসে শুরু করেন সংসার । আমার বাপ-চাচার সবাই স্থানীয় পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছেন । যার কারণে আমার মা এখানকার স্থানীয় কিন্তু আমি স্থানীয় নই ! মা স্থানীয় হওয়াই আমি আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রে দোভাষী অর্থ্যাৎ আমি ঠাকুরগাঁও এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় সমান সমান কথা বুঝতে ও বলতে পারি । আমার ভাইবোন, চাচাতো ভাইবোনদের ক্ষেত্রেও একই । ময়মনসিংহ থেকে হঠাৎ করেই ঠাকুরগাওয়ে পাড়ি জমানোর কারণটা অবশ্য আমি জানতে পেরেছিলাম কিছুদিন আগে দাদার বয়সী একজনের কাছে । তিনিও এখানকার স্থানীয় নন (প্রচলিত রীতি অনুযায়ী) । উনিও দাদার মতো ঠাকুরগাওয়ে স্ত্রী-পুত্রকন্যা নিয়ে ঠাকুরগাওয়ে আসেন । তবে উনি আসেন কুমিল্লা-ত্রিপুরা অঞ্চল থেকে ।
গ্রামের রাস্তা ধরে সেই দাদারবয়সী মানুষটির সাথে হাটতে হাটতে অনেক কিছুই জানলাম । আজকের যে ঠাকুরগাঁওয়ে সেটা আশির দশকে এতোটা বসতপূর্ণ, বনজঙ্গলবিহীন, আবাদী জমি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলোনা । আমাদের আজকের যে গ্রাম এবং আশেপাশের গ্রামগুলো মূলত একেকটা বিশাল বড় বড় জঙ্গল ছিলো । বনবিজ্ঞান সম্পর্কে আমার তেমন একটা ধারণা নেই । তবে উনার ভাষ্য অনুযায়ী, আমি যে পথে আজ হাটছি তার দুপাশে ছিলো বড় বড় উচু টিলা (ছোট পাহাড়েরর মতো), প্রাচীন বড় বড় গাছ আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ । সেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দিনের বেলায় মানুষ একা যেতে ভয় করতো । সন্ধ্যা হলেতো এই রাস্তা ধরে হাটার চিন্তাও করা যেতোনা । ভয়টা ছিলো দুই কারণে । এক, জঙ্গলে মাঝে মাঝেই পাওয়া যেতো বাঘ । আর মানুষখেকো শিয়ালের সংখ্যা এবং তাদের উপদ্রব এতোটাই বেশি ছিলো যে, দিনদুপুরে গৃহস্থ বাড়ি থেকে কয়েকটা শিয়াল এসে গৃহপালিত পশুপাখিকে ধরে নিয়ে যেতো । শুধু পশুপাখি নয়, ছোট ছোট শিশুকে ধরে নিয়ে গিয়েছে । সেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যেতে গিয়ে ভয় পাওয়ার আরেকটা কারণ হলো ভুত-পেত্নীর ভয় । যে অঞ্চল বনের ন্যায় জঙ্গলে বেষ্টিত আর হিংস্র প্রাণীতে পরিপূর্ণ,  সেই অঞ্চলের মানুষগুলোর মনে এই ভয়টা থাকা একেবারেই স্বাভাবিক ।
না, আজকে আর ঠাকুরগাওয়ের গ্রামগুলো এমন নয় । বাঘ আর বন-জঙ্গলের নিশানাও নেই । আমাদের পাশ্ববর্তী কয়েকটা গ্রামে শিয়ালের উপদ্রব কিছুটা থাকলেও তা একেবারেই কম । যে গ্রামে বৃহৎ পরিমাণে আঁখের চাষ হয় সেই অঞ্চলে শিয়ালের উপদ্রবটা লক্ষ্যণীয় । 

অথচ বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের বিশেষ করে নোয়াখালী-লক্ষীপুর-ফেনী-কুমিল্লার যারা সেই সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ে এসেছিলো, তারা আজও জেনে আসছে ঠাকুরগাঁও নাকি একটা বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ জেলা ।
দাদারবয়সী মানুষটার সাথে হেঁটে চলেছি । আমার নিজের দাদাকে স্বচক্ষে দেখিনি । তিনি ঠাকুরগাওয়ে এসেই কিছুদিনের মধ্যে মারা যান । যার ফলে আমার নিজের ছোট চাচা উনাকে স্মরণ রাখতে পারেন নি দাদু দেখতে কেমন ছিলো । 

দাদার বয়সী মানুষগুলো দেখলেই নিজের দাদা মনে হয় । সে কারণেই যাঁর সাথে গল্প করে চলেছি উনাকে আপন মনে করেই একের পর এক জিজ্ঞেস করে চলেছি । উনিও বেশ আগ্রহ সহকারে বলে যাচ্ছেন । 

আমি বললাম, আপনারা এখানে মানে ঠাকুরগাঁওয়ে কেনো এসেছেন?
আমার প্রশ্ন শুনে উনি হেসে দিলেন । তিনি বললেন, আমরা যেখানে আগে থাকতাম সেখানের দু-এক জন সর্বপ্রথম ঠাকুরগাঁওয়ে এমনি বেড়াতে আসে । এখানে এসে দেখে, এখানকার জমিজমার দাম নেই বললেই চলে । তার উপর যতো জমি আছে সব পড়ে আছে । আবাদ করার মতো লোকও নেই । আর ভয়ে কেউ বনজঙ্গল কেটে চাষাবাদ করতে চাইতোনা । তাই বলে এখানকার মানুষ না খেয়ে থাকতো তেমনটিও না । যা উৎপন্ন হতো তা দিয়ে অনায়াসেই রাজার হালে দিন কেটে যেতো সবার । যখন অন্য অঞ্চলের মানুষ যারা জানতে পারলো এখানের পরিবেশের এই অবস্থা তাদের অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে এখানে আসতে লাগলো । এসে বনজঙ্গল কেটে প্রথমে ঘর উঠালো তারপর আবাদী জমি । যে জমিতে আগে বছরে একটা ফসল উৎপন্ন হতো সেই জমিতে আমরা এসে দু তিনটা ফসল উৎপন্ন করি । আমরা যখন এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস শুরু করলাম, তখন আমাদের দেখাদেখি আমাদের আত্মীয় স্বজন ও আগের পাড়া প্রতিবেশীরাও এসে এখানে ঘর উঠালো । এইতো এভাবে একের পর একেকটা পরিবার, সংসার বৃদ্ধির কারণে আমাদের গ্রামসহ পার্শবর্তী কয়েকটা গ্রামে বাইরের অঞ্চলের মানুষদের বসতিতে ধীরে ধীরে আজকের এই অবস্থা । অবস্থা এই হয়েছে যে, আজ স্থানীয়দের চেয়ে বহিরগাতদের সংখ্যাটাই বেশি । 

যাক, এ ব্যাপারে আর এগুলাম না । এতো জেনে কী লাভ ! কে কিভাবে এখানে আসলো, না ঘর বাধলো, না কী করলো তাতে কী আসে যায় ! সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা এখানে অস্থানীয় এবং পদবীতে আমরা ভাটিয়া ! তাই দাদার বয়সী মানুষটার সাথে এ ব্যাপারে আর দ্বিতীয়বার কিছু জিজ্ঞেস করলাম না ।  

ক্লাস নাইন-টেনে পড়াকালীন একটা শব্দের সাথে পরিচিত হই । শব্দটার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয় যে, সে তখন প্রায় ঢাকায় যাওয়া আসা করতো । আমার তখনো ঢাকায় যাওয়া হয়নি । তাই ঢাকার গল্প শুনতে তার সাথে গল্প করতাম । সে বার সে বললো, আমাদের এদিকের মানুষগুলোকে ঢাকা-গাজীপুরের ঐদিকে নাকি মফিজ বলে ডাকে । আমি তাকে বললাম, এটা আবার কেমন কথা ! মফিজ তো একটা মানুষের নাম । কারণ জানতে চাইলে সে বললো, এইদিকের মানুষগুলো বোকা এজন্য মফিজ বলে ডাকে । 

তখন পর্যন্ত মফিজ সম্পর্কে আমার ততোটুকুনই ধারণা । ধারণার পরিধি বাড়ে কয়েক বছর পর যখন থেকে আমি ঢাকায় আসা যাওয়া শুরু করি, দেশের আঞ্চলিক পরিসংখ্যান নিয়ে একটু আধটু ঘাটাঘাটি করি । পরে বুঝতে পারলাম রংপুর বিভাগের বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলটি মঙ্গাপীড়িত । জাতীয় পর্যায়ে অবহেলিত হওয়ার কারণে সারাবাংলাদেশে যতোগুলো বিভাগওয়ারী দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারীর হার রয়েছে তন্মধ্যে রংপুরে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারীর হার সবচেয়ে বেশি । বেশিরভাগ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীলতা এবং নদীবাঁধ ও নদীব্যবস্থা প্রতিকূলে থাকাটাই এখানকার অঞ্চল মঙ্গাপীড়িত হওয়ার অন্যতম কারণ । একদিকে প্রতিকূল অবস্থায় ধান চাষ আর অন্যদিকে ফসলের মূল্য হ্রাস দুটোই একজন কৃষকের জন্য অবশ্যই সুখবর নয় । এদেশে পর্যাপ্ত ধান-গম থাকলেও পূর্বোক্ত চুক্তি অনুযায়ী বাইরের দেশ থেকে ধান-গম আমদানী করতে হয়, কিন্তু কখনোই মাছ আমদানী করতে হয় না । ফলে একজন ধান চাষীর ক্ষতির যে সম্ভাবনা থাকে সেই ক্ষতির সম্ভাবনা কিন্তু একজন মাছচাষীর থাকেনা, বরং রপ্তানী বাজারে মাছ চাষ সর্বদাই সামনের কাতারে । উত্তরবঙ্গ অপেক্ষাকৃত উঁচু ও শুষ্কময় হওয়ার কারণে এখানে মাছ চাষের সম্ভাবনা একেবারেই কম । কিন্তু চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল বিভাগে খুব একটা আবাদী জমি নেই বললেই চলে । সেখানে মানুষদের পেশায় আছে যেমন বৈচিত্র্যতা, তেমনি সেখানকার মাছচাষীরা সর্বদাই সফল । সিলেট বিভাগে আছে চা চাষ  আর জনশক্তি রপ্তানীতে বিশাল খাত । আর ঢাকা ও ঢাকা বিভাগ নিয়ে বেশি কিছু বলার প্রয়োজনই নেই । একদিকে সারাদেশের কেন্দ্রীয় সুবিধা আর অন্যদিকে সমস্ত শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে ঢাকা ও ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতে । একমাত্র রংপুর বিভাগ এসমস্তের কোনোটাতেই নেই । তাহলে রংপুর বিভাগ সবার থেকে পিছিয়ে থাকবেনা কেনো?

মনে হয় একটু বেশিই অপ্রাসঙ্গিক বলে ফেলেছি । মফিজ নিয়ে বলতে গিয়ে শেষ থামলাম রংপুর বিভাগের উন্নয়ন আলোচনায় । কিন্তু এছাড়া আমার যে উপায়ও নেই । আপনিই বলুন কারই বা ইচ্ছে করে তাকে এবং তার অঞ্চলের মানুষগুলোকে শুধুমাত্র দারিদ্র্যতার কারণে এমন কিছু বলুক যাতে মনে কষ্ট পায়, নিজেকে ছোট ভাবে ।  

গতকাল আমার খুব ভালো একটা বন্ধু আমার মনটা খারাপ করে দিয়েছে একটা শব্দ উচ্চারণ করে । তাদের বাসা গাজীপুরে । কথা বলতে বলতে সে একসময় বললো, তোমাদের দিকের মানুষগুলোকে আমরা কী বলে ডাকি জানো? আমিতো জানতাম কী বলে আর ডাকবে ! তবুও বললাম, কী? সে বললো, মফিজ । আমি জানতাম এটাই তার উত্তর । আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তো আমিও মফিজ? সে হাসতে হাসতে বললো, হ্যা । 

হাস্যরসেই হোক আর স্বাভাবিক ভাবেই হোক, সে তো সত্যটাই বলেছে । আমরা তো মফিজই । আমরা কি আর মানুষ? মফিজই আমাদের আসল পরিচয়, মানুষ নয় । পরিচয় যদি মানুষই হতো, সবার আগে গুরুত্ব পেতো আমরা মানুষ । 

আমি আজ খুব ভালো করে বুঝতে পারছি আমি সত্যিই একটা এলিয়েন । জন্মের পর থেকেই শিখেছি ঠাকুরগাঁওয়ে আমার মা স্থানীয় কিন্তু আমি নই । সাবু-হাবুরা এখানে জন্ম নেয়ার সাথে সাথেই স্থানীয়তার সার্টিফিকেট পেয়ে যায়, কিন্তু আমি এখানে জন্মালে সেটা তো পাইনা তার উপর কপালে ‘ভাটিয়া’ সীল লাগিয়ে দেয়া হয় ।  
নিজের জেলার বাইরে গেলেই মাথানিচু করে হাটতে হবে । কারণ আমি সেখানে অস্থানীয় । স্থানীয়দের সামনে মাথা তুলে হাটার অধিকার আমাকে কে দিয়েছে?
আজ আর আমি এসব ভেবে মন খারাপ করিনা । কারণ আমি তো নিজেকে সেই ছোটবেলা থেকেই এলিয়েন ভেবে আসছি । এখন তো সেটা পাকাপোক্ত হলো আর কি ! আমি এই পৃথিবীর কেউ না, এখানে আমার কেউ নেই ।  

লেখক
ইলিয়াস আহমেদ

সময়ের প্রয়োজনঃ সিস্টেম পাল্টানোর যুদ্ধ


‘নিজ ভালো তো জগত ভালো’ এ কথাটার সত্যতা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে । জীবনে অনেক চেষ্টা করেছি ভালো থাকতে কিন্তু পারিনি । জানি, আপনারা বলবেন এটা আমার ব্যর্থতা । আপনাদের চোখে হয়তো সেটাই ঠিক । সত্যিই বলছি, অনেক চেষ্টা করেছি ভালো থাকতে, আমাকে ভালো থাকতে দেয়নি পরিবেশ-পরিস্থিতি । প্রাকৃতিকসত্তা কখনোই পরিবেশের বিরুদ্ধে অবস্থান করে বেঁচে থাকতে পারেনা । কারণ প্রত্যেক পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত হয় একটা না একটা সিস্টেমের দ্বারা । তাই পরিবেশের ভালো-মন্দ নির্ভর করবে সেই সিস্টেমের উপর । সিস্টেম যদি হয় মানবতাহীন সেই সিস্টেমের অন্তর্গত পরিবেশের কাছে মানবতা প্রত্যাশা করাটা নিতান্তই বোকামি ।
যে কেউ চাইলে সেই সিস্টেমে মানবতা দেখতেও পারে আবার দেখাতেও পারে । তবে সেটা মানবতার মোড়কে আবৃত অমানবিক, মিথ্যা-ছলনাতে পরিপূর্ণ ছাড়া কিছুই নয় ।
আজকের এ পৃথিবীতে যার অভিযোজন ক্ষমতা নেই তার বাঁচার অধিকারও নেই, বাঁচলেও স্বগোত্রের দাস হয়ে থাকতে হবে । হার্বাট স্পেন্সারের মতবাদই আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সর্বত্র । বাঁচামরার প্রতিযোগিতায় সবলেরাই বেঁচে থাকবে চিরকাল । এখন সবলেরা যদি হয় অসুর প্রকৃতির, মিথ্যাতে প্রতিষ্ঠিত, স্বার্থপর তবে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্রের ওপর ধনীর বঞ্ছনা, শোষণ, শাসিতের ওপর শাসকের অবিচার, ন্যায়ের ওপর অন্যায়ের বিজয়, সরলের ওপর ধূর্তের বঞ্ছনা অস্বাভাবিক নয় । এটাই আজ সারাপৃথিবীতে পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর ব্যত্যয় খুবই কম । কারণ পৃথিবী আজ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী, সহযোগিতায় নয় ।

স্ব স্ব অবস্থান থেকে সবাই আজ শান্তি চায় । কিন্তু তাদের চাওয়া পাওয়া আহাজারি, প্রার্থনা, লেখালেখি, প্ল্যাকার্ড-ব্যানারেই সীমাবদ্ধ । সর্বোচ্চ সেটা একক গোষ্ঠীয় সশস্ত্র আন্দোলনে রূপ নেয় । কিন্তু তাতে করে আজকের দিনে কোনো শান্তিতো আসছেইনা বরং একদিকে যেমন বাড়ছে অশান্তি, আরেকদিকে শান্তিকামী মানুষের কাছে সেই সশস্ত্র আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে যুক্তিসংগত ভাবেই । যুক্তিসংগত বললাম এ কারণে যে, আজকের দিনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এতোটাই সাফল্য লাভ করেছে ঘরে বসেই একটা সুইচ টিপলেই স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীর বুকে নিক্ষিপ্ত হবে অত্যাধুনিক পারমাণবিক বোমা । পারমাণবিক বোমার ক্ষমতা আজকালকার ছোট ছোট বাচ্চারও জানা আছে । আজকের দিনে যুদ্ধক্ষেত্র বলতে সমগ্র পৃথিবী, কিচেন রুম (রান্নাঘর) পর্যন্ত বাদ যাবেনা । তার উপর পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে যে পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ আছে তা দিয়ে যুদ্ধ শুরু হলে নিমিষেই ধ্বংস হবে এ পৃথিবী । পারমাণবিক অস্ত্র বাদ দিলেও কেবলমাত্র জীবাণু অস্ত্র দিয়েই এ পৃথিবীটাকে কয়েকঘন্টায় মানবহীন করে দেয়া সম্ভব । এতোকিছু চিন্তাকরে কোনো সুস্থবান ব্যক্তিই কল্পনা করতে পারেন না যে, সশস্ত্র আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আছে, সমর্থন দেয়াতো দূরের কথা ।

যুদ্ধ কখনোই কাম্য নয় । তবু যুদ্ধ করতে হয়, বিশ্বমানবতার জন্য, শান্তির জন্য । তাই বলে আমি সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলছিনা । আজ এমন একটা যুদ্ধের প্রয়োজন যার কাছে অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রের কোনোই দাম নেই । দাম নেই বায়োওয়্যারের । যে যুদ্ধে প্রয়োজন হবেনা কোনো সামরিক অস্ত্র । যে যুদ্ধে নাশকতার কোনো বালাই থাকবেনা, থাকবেনা প্রাণহানি, তবে শান্তিপক্ষের প্রাণহানি ঘটতেই পারে, যোদ্ধাদের এতোটুকুন বিসর্জন আন্দোলনে দিতেই হবে ।

এই যুদ্ধটা আজ খুবই প্রয়োজন । কারণ মিথ্যাতে পরিপূর্ণ, শান্তিতের অন্তরায় এক ভয়ংকর সিস্টেম পৃথিবীর পরিবেশকে করেছে কলুষিত, অন্যায়ে পরিপূর্ণ, ছলনায় ভরপুর । এই ভয়ংকর সিস্টেম সারাপৃথিবীকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে আছে সবাই যেনো তার দৈহিক-মানসিক দাস । সে যাই করতে বলে তাই আমরা করি, সে যেটাই ভাবায় সেটাই আমরা ভাবি, সে যে স্বপ্ন দেখায় সেই স্বপ্নে আমরা থাকি বিভোর । সে যেটাকে অন্যায় বলে সেটাকেই আমরা অন্যায় বলে জানি । অথচ সে যেটাকে মিথ্যা বলে সেটাই সত্যি । সে যেটাকে অশান্তির কারণ বলে, সেটাই শান্তির কারণ । আমাদের চিন্তাভাবনা, আরাধনায় আজ সেই সিস্টেম বিরাজ করছে । তার হুকুমেই চলছে সমগ্র পৃথিবী । যেনো এক আসুরিক ঈশ্বরের রাজত্ব চলছে পৃথিবীর বুকে । এই ভয়াল সিস্টেম থেকে কেউ রেহায় পায়নি । যেখানে মিথ্যায়. ধূর্ততায়, প্রবঞ্চনায়, অন্যায়ে পৃথিবীকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে সে, সেখানে আমার ভালো থাকা মানে বিশাল আগুণের কুন্ডলীতে একফোটা জলের অস্তিত্ব টিকে থাকা । মানুষ তার স্ব স্ব অবস্থান থেকে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে ভালো থাকার, কিন্তু পারছে কই?

যে সিস্টেম আমাদেরকে ভালো থাকতে দিচ্ছেনা, আমাদেরকে অশান্তির অনলে দিবারাত্রি পুড়িয়ে মারছে, যে সিস্টেম আমাদেরকে বাধ্য করছে অসৎ হওয়ার জন্য, যে সিস্টেম আমাদেরকে উপহার দিচ্ছে একেকটা ঐশী, সেই সিস্টেমকে পাল্টানো আজ জরুরী হয়ে পড়েছে । যে সিস্টেমের কারণে শিক্ষিত পরিবারে শিক্ষিত গৃহবধূ মেহজাবিন পর্যন্ত শারীরিক-মানসিক নির্যাতন থেকে রেহায় পায় না, রেহায় পায়না কাজের মেয়ে যে কিনা শুধুমাত্র দরিদ্রের জন্য পাষবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে; যে সিস্টেম থেকে রেহায় পায়না সাগর-রুনি-বিশ্বজিৎরা সেই সিস্টেম পৃথিবীতের রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই । যে সিস্টেম দরিদ্রকে আজীবন দরিদ্র রেখে দানখয়রাত-ভিক্ষা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে সমাজে নিজেকে দানবীর বলে জাহির করতে চায়, সৃষ্টিকর্তার কাছে মুত্তাকী সাজতে চায়; যে সিস্টেম নারীকে আবদ্ধ রাখতে চায় চারদেয়ালের মাঝে কিংবা যে সিস্টেম নারীকে নগ্ন করে ভোগ্যপণ্য এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা করতে চায় সেই সিস্টেম কখনোই মানবতাবাদী নয় । যে সিস্টেম ইসলামী মিলিশিয়ান্টদের ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে এবং তা সত্ত্বেও তাদের সাথে লুকোচুরি খেলে বাকি পৃথিবীরে সাধারণ মানুষগুলোর প্রাণহানি করছে; আবালবৃদ্ধাবণিতার উপর অবরোধ চাপিয়ে দিচ্ছে; ইসলামকে সারাবিশ্বের সামনে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করছে সেই সিস্টেম কখনোই শান্তিকামী নয় । যে সিস্টেমের কারণে আজ পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহায় পাচ্ছেনা নারী, শিশু, কন্যা, কিশোর কেউই এমনকি নিজের মা-বোন-সন্তান পর্যন্ত সেই সিস্টেম কখনোই সভ্যতার দাবিদার হতে পারে না । যে সিস্টেমের কারণে মানুষ আজ অনৈক্যে জর্জরিত, দলাদলিতে খুনাখুনিতে পবিত্রভূমি করেছে অপবিত্র, একে অপরেরর দোষারোপে জাতিতে জাতিতে সৃষ্টি করেছে ঘৃণা, বিরোধ, বৈষম্য; যে সিস্টেম পৃথিবীকে কাঁটাতার আর প্রাচীরে খন্ডবিখন্ডিত করেছে সেটা কখনোই স্বাধীনতাকামী হতে পারে না ।

তাই সময়ের প্রয়োজনে আজ এমন একটা যোদ্ধাদলের প্রয়োজন যারা রচনা করবে বজ্রশক্তির বূহ্য, যাদের ঢাল হবে সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায়, যাদের বূহ্য ভেদ করতে পারবেনা সেই মিথ্যাশ্রিত সিস্টেম । আজ এমন একটা বূহ্যের প্রয়োজন যা হবে মহাসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত । যাদের সাথে পৃথিবীর থাকবে চতুর্মাত্রিক বিরোধিতা, বৈপরীত্যতা, অথচ থাকবে স্রষ্টার অপার সাহায্য; সেই মহাসত্য দেখে মিথ্যা ধূলিস্মাত হয়ে যাবে । আজ এমন একটা আদর্শের প্রয়োজন যা হবে মহাসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, এই সত্যই প্রচলিত সিস্টেমের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে । কারণ আজ পৃথিবী যে সিস্টেমের উপর দাঁড়িয়ে আছে সেই সিস্টেম মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত । ছলনাময়ী, মিথ্যাশ্রয়ী সিস্টেম মহাসত্য দেখে তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়বে । সেদিন মহামিথ্যুক সিস্টেমের অত্যাধুনিক অস্ত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে । অস্ত্র পরে রবে অস্ত্রাগারে । মানুষ সেদিন ভুল করেও সেই অস্ত্র মানুষের সামনে তাক করবেনা । কারণ সত্য ‍সুন্দর । সত্যই শান্তি । সত্যই স্বর্গ । সত্যই স্রষ্টা ।

লেখক
ইলিয়াস আহমেদ

জঙ্গিবাদ! গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার নির্বোধ মোসলেম জাতি


অস্ত্র কেনো রাখা হয়? চোর ডাকাত ধরার জন্য? নাকি সন্ত্রাসবাদ ধ্বংস করার জন্য?

জানি প্রশ্নটা অসম্পূর্ণ হয়ে গেছে । এর উত্তর কেবল শর্তানুসারেই দেয়া সম্ভব ।
যেমন চোর ডাকাতকে ধরতে নিশ্চয় ড্রোন বিমান, মিশাইল, রাসায়নিক অস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্র লাগেনা?

তাহলে এসব রাখা হয় কেনো? যাদের কাছে এসব অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রগুলো আছে, তারা এককথায় উত্তর দেবে সন্ত্রাসবাদ ধ্বংস করে পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য ।

প্রশ্নের এধরণের উত্তর শোনেই আমরা অভ্যস্ত ।

শান্তিকামী মানবতাবাদীদের মন ভোলানো কথা শোনার আগে পরিসংখ্যানে দেখে নিই, কারা এই অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের স্রষ্টা ও সরবরাহকর্তা ?

বিশ্ব অস্ত্র বাণিজ্যে ৩০ শতাংশ অংশদারীত্ব নিয়ে প্রথম অবস্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২৬ শতাংশ অংশদারীত্ব নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে রাশিয়া । এ তালিকায় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে যথাক্রমে জার্মানি, ফ্রান্স ও চীন ।
[সূত্র: www.theholytimes.com/front/viewnews/1061]

অস্ত্র বাণিজ্য শব্দটা যখন এসে গেছে তখন এর প্রায়োগিক ক্ষেত্রের প্রসঙ্গটা এড়ানোর সুযোগ নেই । প্রশ্ন না করতেই প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আমরা যে উত্তর পাবো তা হোলো-
সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক শান্তিরক্ষীবাহিনী, বিশেষ সৈন্যবাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ দমন, গৃহযুদ্ধের অবসান ইত্যাদি।

এটা কাউকে বলে দিতে হবেনা যে, যতো রকম জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ ইস্যু আছে তা সিংহভাগেরেও অধিক মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে ।
মধ্যপ্রাচ্যের নাম শুনলেই সারা পৃথিবীর চোখের সামনে ভেসে আসে জঙ্গি সংগঠন গুলোর জঙ্গিবাদের চিত্র ।
কানে ভেসে আসে জেহাদ নামের বিষাক্ত একটা উচ্চারণ । আর মুখ ভরে থুথু আসে ঐ জেহাদী কট্টরপন্থী মোসলেমদের হাতে অস্ত্র দেখে । শান্তি প্রিয় মোসলেমরা কানে আঙ্গুল গুঁজে বলে ইসলাম শান্তির ধর্ম ।
কারো যেনো কোনো দায় নেই; সব দায় বুঝি ঐ জঙ্গিদের, মোসলেম জাতিটির !

অথচ যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবাদ দমনকরার নামে অথবা পারমাণবিক অস্ত্ররাখার সন্দেহবশত অথবা সরকারপক্ষের সাথে বিরোধীপক্ষের গৃহযুদ্ধ থামানোর কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেয় । কিন্তু দেখা যাবে তাদের চাপিয়ে দেয়া গণতন্ত্রের ফলেই মোসলেম দেশে গৃহযুদ্ধের সৃষ্টি । জঙ্গিবাদ দমনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বাড়িঘর উড়িয়ে দিয়ে কবরস্থানে পরিণত করে । বাদ যায় না নারী শিশু । ধর্ষণের চিত্র মিডিয়ায় ভেসে আসেনা । শিরোনামে ভাসে শুধু "জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সফল অভিযান !" আর জাতিসংঘ মুচকি হাসিতে সাফল্যের পোজ দেয় ।

এতো বড় অন্যায়ের ক্ষীণকন্ঠে সামান্য প্রতিবাদ আসলেও প্রভূত্বের তাবেদারির বাতাসে তা মিশে যায় । বিশ্ববিবেক তখন যেনো অট্টহাসি দিতেও ভয় পায়।

ওদিকে নিঃস্ব-অসহায়-নির্যাতিত-গৃহহারা মোসলেম জাতিটি থেকে প্রতিবাদ স্বরূপ জন্ম নয় এক একটা সশস্ত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী । পরবর্তীতে যাদের নাম হয় তালেবান, আল কায়েদার মতো জঙ্গি দল ।
সম্প্রতি একটা ভাষণে হিলারি ক্লিনটন নিজেই স্বীকার করে বলেছেন, "We created Al-Qayeda"
[সূত্র: www.youtube.com/watch?v=Dqn0bm4E9yw]

আল কায়েদা যে যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা মদদপুষ্ট, এসম্পর্কে Michel Chossudovsky এর দেয়া সাক্ষাতকারকে উড়িয়ে দেয়া যায়না ।
[সূত্র: www.globalresearch.ca]

ইরাকের ISIL জঙ্গি সংগঠন সম্পর্কে লেবাননের দৈনিক আদ দিয়ার পত্রিকাটি সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করেছে । বলা হয়েছে সংগঠনটির নেতা আবু বকর আল বাগদাদী ইহুদি পরিবারের সন্তান । তার প্রকৃত নাম শামউন ইয়লুত । এ তথ্যের সূত্র বেরিয়েছে আমেরিকার জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা NSA'র সাবেক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা দলিল-দস্তাবেজ থেকে ।
এর আগেও স্নোডেনের ফাঁস করা দলিল থেকে জানা গেছে, ইসরাঈলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কথিত আবু বকর আল বাগদাদীকে এক বছর ধরে ধর্মীয় ও সামরিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং জেহাদ ও ইসলামের নামে ইসরাঈলের নিরাপত্তাবিরোধী বিশেষতই মোসলেম দেশগুলোতে সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্যই ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা MI-6, ইসরাঈলের মোসাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের NSA-এর তত্ত্বাবধানে জন্ম দেয়া হয়েছে ISIL-এর ।

অর্থ্যাৎ ব্রিটেন -যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাঈলের ঔরসে জন্ম নিলো জঙ্গি সংগঠন ISIL.

এটার যে যথার্থই সত্যতা রয়েছে, তার প্রমাণ মেলে আল-জাজিরা খবরে । সেখানে গত ২২.০৬.২০১৪ তারিখের টাইমলাইনে বলা হয় ISIL using US vehicles to fight Syria rivals. তার মানে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে তাদের দেয়া অস্ত্রেই ইরাকসহ সিরিয়াতে সন্ত্রাসী চালাচ্ছে ISIL.

অথচ এই সন্ত্রাসদের দেশ থেকে উৎখাত করার জন্য যখন ইরাকের প্রধাণমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র কিনতে চেয়েছিলো, যুক্তরাষ্ট্র নাকচ করে দিয়েছিলো ।
[সূত্র: আল জাজিরা, টাইমলাইন: ১২.০৬.২০১৪]

যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে বিশ্ব বাজারে অত্যাধুনিক অস্ত্রের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়া হয় । যখনই কোনো বড় ধরণের ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন করা হয়, তখন বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় নিজেদের অস্তিত্বকে টিকে রাখা ও নিরাপত্তার তাগিদে ইরান,ভারত, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও পারমাণবিক ও অত্যাধুনিক অস্ত্র পুঁজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । অস্ত্র বাণিজ্যে ঠিক এসময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যায় । তবে অস্ত্র রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রই এগিয়ে । একটা কথা মনে রাখতে হবে অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেই অস্ত্রের চাহিদা বাড়বে ।আর এ চাহিদার যোগান ঐ দেশগুলোই দিয়ে থাকে । অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করতে হিরোশিমা, নাগাসাকি, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ভিয়েতনাম, গাজার মতো ভূখন্ডকে ঝলসিয়ে দেয়া হয় । তালেবান, আইএসআইএল,আলকায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠন তৈরি করে, তাদের হাতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে মোসলেম দেশগুলোতে অরাজকতা, সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি করা হয় । বাধ্য হয়ে সে দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধাণ জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের কাছে অস্ত্র কিনতে আগ্রহী হয় । যেমনটি ISIL কে নির্মূল করতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মালিকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র কিনতে গিয়েছিল ।

এথেকে কি বোঝা যায় না, সন্ত্রাসবাদ দমন নয়, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে অস্ত্রবাণিজ্য ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করাই যূক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ?

যুক্তরাষ্ট্রই যে মানবতার বিপক্ষে তার প্রমাণ সম্প্রতি গাজা ইসরাঈল যুদ্ধেই প্রমাণ মেলে ।
জাতিসংঘসহ সমগ্রবিশ্ব যখন গাজার পক্ষে তখন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাঈলের কাছে সামরিক অস্ত্র বিক্রি করছে।
[খবর মানবজমিন: ৩১.০৭.২০১৪]

আমরা যদি অতীতের দিকে
লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্টে যথাক্রমে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা ফেলে । লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে । প্রতিবন্ধীর সংখ্যাটা তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ কিছুই ছিলোনা। তাহলে সেখানে কেনো মারণাস্ত্রের আঘাত হানা হলো?
ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা মনে আছে? ঐ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অ্যাজেন্ট অরেঞ্জ ব্যবহার করে এক ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো? নাম দিয়েছিলে "অপারেশন রেঞ্চ হ্যান্ড ।"
এ যুদ্ধে ৪ লক্ষ মানুষ নিহত ও পঙ্গু হয় আর ৫ লক্ষ শিশু জন্ম নেয় প্রতিবন্ধী হয়ে। তখন কোথায় ছিলো তাদের মানবতা? কোথায় ছিলো জঙ্গিবাদ দমনের বুলি আওরানো? কোনো উত্তর দিতে পারবে কি?

আসলে এরাই মানবতার মোড়কে জঙ্গিবাদ বিক্রি করে ।


এই জঙ্গি সংগঠনগুলোর সবাই যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাঈল ব্রিটেনের মদদপুষ্ট তা কিন্তু নয় । কিন্তু কথা হচ্ছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে তারাই জঙ্গিসংগঠনের স্রষ্টা । যার সত্যতা হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্য, স্নোডেনের ফাঁসকৃত তথ্য, আলজাজিরার নিউজ ইত্যাদিতে নিহিত রয়েছে ।
এই জঙ্গিবাদ ধীরে ধীরে পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই ছড়িয়ে পড়ে । জন্ম নেয় অসংখ্য জঙ্গি সংগঠনের । জঙ্গিবাদকে তখন আর কেউ ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে দেখেনা, বিবর্তনে জঙ্গিবাদ হয়ে যায় আদর্শ । আর এই আদর্শে সবাই এসলামকে ছিঃ ছিঃ বলে ।
কারণ হিসেবে নিন্দুকেরা বলে কোরানে জেহাদের কথা আছে, কেতালের কথা আছে, শহীদের কথা আছে, হুরপরী পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে ইত্যাদি ইত্যাদি ।

কিন্তু তাদের চোখে ভাসেনা যে, কোরানে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বলা আছে ।
[কোরান: সূরা বাকারাহ-(১২,১৩), ২৭, ৩০, ৬০ সহ বহু আয়াত]

তাহলে আল্লাহ তবু কেনো জেহাদ-কেতালের কথা উল্লেখ করেছেন?
এ প্রশ্ন কি নিন্দুকের মনে জাগেনা?
জেহাদ, কেতাল ও সন্ত্রাস যে এক জিনিস না, তা মোসলেম জাতিটি ভূলেই গেছে । তাই তারা বারবার ইহুদি খৃষ্টানদের গভীর ফাঁদে পা দিচ্ছে । আর বিশ্ব মানুষের কাছে এসলামের নাম হয় সন্ত্রাসী ধর্ম ।

[জেহাদ, কেতাল ও সন্ত্রাস যে একজিনিস নয়, তা জানতে মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর লেখা "জেহাদ, কেতাল ও সন্ত্রাস" বইটি পড়তে পারেন ]

আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস বুঝতে পেরে ISIL এর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ইরানের বিশিষ্ট আলেম ও তেহারানের জুম্মা সালাহর অস্থায়ী খতিব আয়াতুল্লাহ মুহাম্মদ আলী মুওয়াহহিদি কিরমানি জুম্মার খুতবায় তা উল্লেখ করেন । তিনি শুধু ইরাকে আইএসআইএল-এর সন্ত্রাসবাদ ও গাজার উপর ইসরাঈলের আক্রমণকে উল্লেখ করে বলেন, আজকাল ইরাকে যা ঘটছে তা শিয়া-সুন্নীর দ্বন্দ্ব না, বরং মানুষকে হত্যা ও মানুষকে সহায়তার মধ্যে দ্বন্দ্ধ ।

তিনি বিশ্বের সকল ফেরকা মাযহাবের মোসলেমদের ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান করেন ।

সত্যিকার অর্থেই আয়াতুল্লাহ কিরমানির এ আহ্বান অত্যন্ত যৌক্তিক । এখনো যদি বিশ্বের মোসলেমজাতিটি সহ অন্যান্য জাতিগুলো এই আধিপত্যবাদী ও মানবতার মোড়কে আবৃত ধূর্তবাজদের বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে গাজা, ফিলিস্তিনি, হিরোশিমা, নাগাসাকি, ভিয়েতনামসহ প্রভৃতি ভূখন্ডের মানুষদের মতো নির্যাতিত, নিপীড়িত, ধর্ষিত হয়ে মরতে হবে । প্রত্যেকের স্বদেশ মৃত্যু উপত্যাকায় রূপ নেবে । মানবতার যেটুকু আছে সেটাও হারিয়ে যাবে পারমাণবিক, রাসায়নিক, জীবাণু যুদ্ধের দামামায় ।

লেখক
ইলিয়াস আহমেদ