Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

ভালোবাসা প্রকাশের লক্ষ্যে দিবস উদযাপন ও আমরা বাঙ্গালি


পৃথিবীতে বোধহয় আমরাই একটা জাতি, যে জাতি  বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বলতে পারে-
পারিবারিক ভালোবাসা, সুসম্পর্ক ইত্যাদি প্রকাশ করার জন্য স্পেশাল কোনো দিবস বা উপলক্ষ্যের প্রয়োজন নেই ।

ভালোবাসা প্রকাশের লক্ষ্যে দিবস উদযাপন ও আমরা বাঙ্গালি

কারণ বছরের প্রায় প্রতিটা দিনেই সকাল থেকে ঘুমের আগ পর্যন্ত-
এখানকার সন্তানেরা মা-বাবার অকৃত্রিম আদর-স্নেহে থাকে । মায়ের বকুনি, বাবার শাসন, বড় আপুর আদর, ভাইয়ার দুষ্টুমি লেগেই থাকে । মায়ের ঘুম পাড়ানি গান শুনে আমরা ঘুমোতে যাই আবার মায়ের ডাকেই জেগে উঠি সকালে । আমাদের বাবাগুলো অন্যরকম ভালোবাসেন আমাদেরকে । ক্ষেতখামার,ব্যবসা,অফিস থেকে ক্লান্তি হয়ে ফেরার পরেও পরম আদরে আমাদেরকে কোলে তুলে নিয়ে বলে, আমার মা, আমার বাবা ! হাতে একটা খাবারের প্যাকেট ধরে দিয়ে যখন কপালে-মুখে চুমু দেয় তখন মনে হয়, এরচেয়ে সুখকর কিছু থাকতে পারেনা ।
স্কুল-কলেজের ছুটি পেলেই আমরা দাদা-দাদী, নানা-নানী, মামা-মামীর বাসায় বেড়াতে যাই । মামাতো-খালাতো ভাইবোনগুলোর সাথে আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়, দুষ্টুমিতে মেতে থাকি ।দাদা-দাদী, নানা-নানী আমাদের অন্যরকম বন্ধু । খুব মজা করি তাঁদের সাথে  । শেষ বয়সে নাতি-নাতনীদের নিয়ে তাঁরা জীবনের শেষ দিনগুলো বেশ আরাম আর সুখ-স্বচ্ছন্দ্যেই কাটিয়ে দেয় । আমরাই একটা জাতি, যে জাতির সন্তানেরা বড় হয়েও তার মা, বোন, ভাবি’র কাছে টাকা চাইতে লজ্জাবোধ করিনা ।

আবহমান বাঙ্গালি পরিবারে ভালোবাসা

সম্পর্কের বাঁধনে এভাবেই আটকা পড়ে পারিবারিক শৃঙ্খলায় গড়ে উঠে এখানকার প্রত্যেকটা সুখী পরিবার । ভালোবাসা মিশে থাকে জীবনের পরতে পরতে । আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের গল্পগুলো ব্যতিক্রম, অকৃত্রিম । মা-বাবা, পরিবার পরিজনের ভালোবাসা তো সর্বদাই লেগে আছে । কিন্তু মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, বড় আপুর প্রতি ছোট ভাই বা বোনোর ভালোবাসা, বড় ভাইয়ের প্রতি ছোট ভাই বা বোনের ভালোবাসাগুলো প্রকাশ পায় গোপনে এবং প্রতিনিয়ত ।

অথচ বর্তমান সভ্যতার অন্যতম ধারক ও বাহক, উন্নতির মানদন্ড নির্ণায়ক জাতিগুলোর মাঝে এই পারিবারিক শৃঙ্খলা, সুসম্পর্কের অবস্থান একেবারেই বিপরীত । লাগামহীন যান্ত্রিক সভ্যতায় তারা এতো পরিমাণ সম্পৃক্ত, যার কারণে তাদের চিন্তা-চেতনা, মনমস্তিষ্কে বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, একমাত্র অর্থনৈতিক উন্নতিই সার্বিক উন্নয়নের মানদন্ড । সময় তাদের কাছে এতোই বেশি মূল্যবান হয়ে গেছে যে, সন্তানের দেখভাল করার সময়টুকুন পর্যন্ত নেই । অফিস করার আগে ডে-কেয়ারে ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে রেখে সারাদিন অফিস করার পর বাসায় ফেরার পথে সঙ্গে করে নিয়ে আসে । বাসায় এসে এতোটুকুন সময় নষ্ট করতে তারা রাজি নন । কাজের ব্যস্ততায় অনেক মা তার সন্তানকে কেয়ারটেকারের কাছে রেখে আবারও বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন । ফলে সেই শিশুটি বড়ই হয় তার মায়ের ভালোবাসা ছাড়াই । মায়ের বুকের দুধ তারা খুব কমই পায় । মা কী জিনিস, মায়ের ভালোবাসা কেমন সেটা তারা কখনই উপলব্ধি করতে পারেনা ।

পাশ্চাত্যের পরিবার ভাঙ্গন

বাবা সারা দিনরাত ব্যবসা-বাণিজ্য, পার্টি-বার, আড্ডায় ব্যস্ত থাকে । মায়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা । মাসের বেশিরভাগ দিনগুলোতে স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় থাকেনা । তার বদলে রাত কাটায় কথিত গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ডের সাথে । ভোগবাদী দেহসর্বস্ব এরকম একটা জীবনব্যবস্থায় তারা অভ্যস্ত । সন্তান যখন একটু বড় হয় তখন সে নিজের চোখেই এসব দেখে তাদের কেউ সেই লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত হয়ে সেই ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মে নিয়ে যায়, অনেকে আবার অভ্যস্ত হতে না পেরে মনের ভিতর চরম ঘৃণা-বিদ্বেষ নিয়ে বড় হয়ে অনেক অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে । জড়বাদী সভ্যতায় প্রতিযোগী মনোভাবে বড় হওয়া পরিবারের ভাইবোনগুলোর মাঝেও তেমন কোনো ভালো সম্পর্ক থাকেনা । উঠতি বয়সে ছেলেমেয়েরা জীবনকে বুঝে নিতে একরকম বাধ্য হয় । পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যত্র স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করে । মা-বাবার ভালোবাসাহীন এই সন্তানটি যুবক বয়সে নারী-গাড়ি-বাড়ি-পণ্য ভোগ করার মাঝে নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে । তার বিকল্প নেই । কারণ পরিবারের ভালোবাসা কী জিনিস সেটা তার জানা নেই । যেটুকুন সময় সে একা থাকে তাকে একাকীত্ব পেয়ে বসে । সেখানেও নিজের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা । অ্যালকোহলের পানি দিয়ে সেই একাকীত্ব ঘুঁচানোর চেষ্টা  । যখন যৌবন ফুরিয়ে যায়, শক্তি ফুরিয়ে যায় এই মানুষটি শেষ জীবনে চরম দুঃখ-কষ্ট আর একাকীত্বের মাঝে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেষ্টা করে । জীবনটা তখন তার কাছে বিরাট প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায় । জীবনের অর্থ কী? কিন্তু সর্বোপরি মানুষ হওয়াই মানবিক চাহিদার কারণেই হোক আর অন্য কারণেই হোক, মা-বাবার ভালোবাসার প্রতি দুর্বোধ্য চাহিদা, দুর্নিবার আকর্ষণ কখনই ভুলতে পারেনা । কোনো কিছুই সেই ভালোবাসার ঘাটতি পূরণ করতে পারেনা । তাই জড়বাদী, যান্ত্রিক এই জীবনে অন্তত একটা দিনে মায়ের প্রতি ভালোবাসা, বাবার প্রতি ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি বাবা-মার ভালোবাসা প্রকাশ করার ব্যাকুল আকাঙ্খা, ইচ্ছাই বিশ্ব মা দিবস, বাবা দিবস, ভ্যালেন্টাইনস দিবসের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ । যান্ত্রিক ও ব্যস্তময় জীবনে এতোটুকুনই সময় মিলে ভালোবাসা প্রদর্শণের ।

মানুষ হয়েও জীবনের দুরকম গল্প, একই ক্যানভাস হয়েও দুরকম ছবি । এখানেই সবার সাথে আমাদের ফারাক । কারণ আমরা বাঙ্গালি আবহমান থেকেই পরিবারে বিশ্বাসী কিন্তু দেহসর্বস্ব নই । আমরা আনন্দ-বেদনা উপভোগ করি কিন্তু ভোগবাদী নই । আমরা সেক্যুলার কিন্তু আত্মাহীন নই । আমাদের জীবনে দুঃখ-কষ্ট আছে কিন্তু আমরা জড়বাদী নই । জড়বাদী জাতিগুলো মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য বিশ্ব মা দিবস কিংবা বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য বিশ্ব বাবা দিবস, প্রেমীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য বিশ্ব ভ্যালেন্টাইনস দিবস পালন করে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পন্ন করে কৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শনের চেষ্টা করে আর আমরা সারাজীবন তাদেরকে ভালোবেসে মনে মনে বলি, ‘মাগো, ও বাবা, আজও তোমাদেরকে ভালোবাসতে পারলাম না । তোমাদের ঋণ কখনোই শোধ করতে পারবোনা ।’

তোমরা যখন ঘটা করে মেসেজ-ইমেইল পাঠিয়ে, ভয়েস কল দিয়ে, কার্ড দিয়ে অথবা সরাসরি মায়ের কাছে কিংবা বাবার কাছে গিয়ে বলছো, ভালোবাসি তোমাকে খুব; তখনও আমি বলবো আমি কখনই এটি বলতে পারিনি । বলতেও চাই না । কারণ প্রতিটি ক্ষণই আমার ভালোবাসা মিশে থাকুক আমার মায়ের প্রতি, আমার বাবার প্রতি, স্ত্রীর প্রতি আমার পরিবারের প্রতি । ভালোবাসা প্রদর্শণের জন্য বিশেষ উপলক্ষ্য লাগেনা, দিবস লাগেনা, বিশেষ দিনক্ষণ লাগেনা । আমি এখনও ওদের মতো যান্ত্রিক হয়ে যাই নি যে, মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শণের সময় আমার নেই ।

আমার একদিনের ভালোবাসা প্রদর্শণ যেনো তাঁদেরকে ছোট না করে । আমার মা, আমার বাবা, আমার প্রিয়জনেরা বেঁচে থাকুক সবসময় আমাতে ।

- ইলিয়াস আহমেদ

ধর্মব্যবসায়ীদের কূপমণ্ডূকতায় ব্যর্থ হল লেনিনের পরিকল্পনা (বামদের জন্য শিক্ষনীয়)


সারা দুনিয়ায় কিছুদিন আগে বাম আদর্শের জয়জয়কার ছিল, এখনও বাম আন্দোলন টিকে আছে তাত্ত্বিকভাবে, বহু মানুষের মুখে বামপন্থীদের নাম সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে এখনো উচ্চারিত হয়। পুরো রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা, ভারত উপমহাদেশের বুদ্ধিজীবী মহল, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ বাম ঘরানার। আমরা বাম আদর্শের উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে যতটুকু জানতে পারি তা হচ্ছে, ইংল্যান্ডে যখন প্রথম রাষ্ট্রীয়জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা আরম্ভ হলো তখন থেকেই মানুষ জাতীয় চরিত্রে চরম বৈষয়িক ও বস্তুবাদী হয়ে পড়তে আরম্ভ করল। তখন অর্থনীতি ছিল সুদভিত্তিক পুঁজিবাদ এবং শাসনতন্ত্র ছিল সামন্তবাদ। সুদী অর্থনীতির ফলে সমাজের কেউ হয়ে গেল অকল্পনীয় অর্থ-বিত্তের মালিক আর কেউ হয়ে গেল দারিদ্র্যের নির্মম শিকার। শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কাঁচামাল থেকে ব্যবহার্য সামগ্রী উৎপাদনকারী যে বিপুল সংখ্যক কারখানা সৃষ্টি হলো, প্রায় কোটি কোটি মানুষকে একরকম বাধ্য করা হলো সামান্য মজুরিতে সেই কারখানাগুলোতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করার জন্য। সামন্তবাদী রাষ্ট্রগুলোতে এই শ্রমিকবর্গসহ নিু শ্রেণির মানুষগুলোর শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদির কোনো ব্যবস্থা রইল না, তারা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হলো। আজকের সংশোধিত পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি দাওয়া ও আন্দোলনের কারণে, শ্রমজীবী মানুষের বিক্ষোভের ভয়ে কিছু কিছু অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আজ থেকে ১০০ বছর আগেও এই গণতন্ত্রের সমাজব্যবস্থায় শ্রেণিহীন মানুষের দুর্গতির কথা পড়লে চোখের পানি ধরে রাখতে কষ্ট হয়। এই অবস্থার কারণে ইউরোপের জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন যে, কী করে এই মানুষগুলোকে মুক্তি দেয়া যায়? সেই জ্ঞানী-গুণী, মুক্তচিন্তার মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলেন কার্ল মার্কস, লেনিন এরা। তারা চেষ্টা করলেন মানুষকে অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি দেবার জন্য। যতটুকু বোঝা যায় তাদের অভিপ্রায় ভালোই ছিল। তখন তারা চিন্তা করে দেখলেন যে, ধর্মের মধ্যে সমাধান খুঁজে লাভ নেই, সেগুলো মানুষকে বুঁদ করে ফেলে, সেগুলো মানুষের ব্যবহারিক জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান দিতে অক্ষম।

ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পাশবিক পীড়নের পর বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মানবজাতির সামনে আশার বাতি নিয়ে হাজির হয়েছিল সমাজতন্ত্র নামক মতবাদ। পতঙ্গ যেমন অন্ধ মোহে আগুনের শিখায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি সারা পৃথিবীর তরুণ যুবক সমাজতন্ত্রের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। মানুষের ভিতরে বিপ্লবের যে চিরন্তন আকাক্সক্ষা সুপ্ত থাকে সেটা জাগিয়ে তুলেছিল সমাজতান্ত্রিক পুরোধারা। কিন্তু আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পতঙ্গের যা পরিণতি হয়, অর্থাৎ মৃত্যু; সমাজতন্ত্রের বেলাতেও সেটাই ঘোটেছে। চাকচিক্যময় মাকাল ফল সদৃশ এই মার্কসীয় মতবাদের অভ্যন্তরে যে বিষময় কদর্যতা লুকিয়ে আছে তার প্রকাশ ঘটতে ৭৫ বছরের অধিক সময় পার হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর যে কয়টি স্থানেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেখানেই সৃষ্টি হয়েছিল চূড়ান্ত ভারসাম্যহীনতা, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, পদদলিত হয়েছিল মানবতা। মানুষের আত্মা ত্রাহিস্বরে চিৎকার করে উঠেছিল কেবল মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নিয়ে। অথচ এই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে মার্কস লেনিন প্রমুখ তাত্ত্বিকরা আখ্যা দিয়েছিলেন ‘স্বর্গরাজ্য’। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে অর্থাৎ রেডিও, টেলিভিশনে-এ কথা লক্ষ কোটি বার বলা হয়েছে যে সাম্যবাদী সমাজে, দেশে থাকা স্বর্গের সুখে থাকার সমান। এখানে লক্ষণীয় যে, তারা তাদের সমাজটাকে সর্বদাই স্বর্গ (চধৎধফরংব) বলে বাকি পৃথিবীকে সাম্যবাদ গ্রহণ করে স্বর্গে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত কঠিন বাস্তবতাই প্রমাণ করে দিয়েছে যে সমাজতন্ত্র যে স্বপ্ন দেখিয়েছে সেটা বাস্তবতার ঠিক উল্টো।

কমিউনিস্টদের এই নিদারুণ ব্যর্থতার কারণ আগেই বলেছি যে মানুষ কেবল দেহ নয়, তার আত্মাও আছে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন কার্ল মার্কসের তত্ত্বের বাস্তব রূপকার ভ.ই.লেনিন কিন্তু এর কোনো সমাধান করে যেতে পারেন নি দু’টি কারণে। প্রথমত ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র, এবং দ্বিতীয়ত বিকৃত ইসলামের ধারক-বাহক কূপমণ্ডূক মোল্লাদের ইসলাম-পরিপন্থী ফতোয়াবাজি।
সমাজতন্ত্রীরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার ধ্বজাধারী মনে করেন এবং পক্ষান্তরে ইসলামসহ সকল ধর্মমতকে একচেটিয়াভাবে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করেন, সকল ধর্মকে স্থবির, কল্পকাহিনী, জড়তা, কূপমণ্ডূকতা বলে গালিগালাজ করেন, বিশেষ করে মুসলিমদেরকে পশ্চাৎপদ, গোঁড়া, মধ্যযুগীয়, অন্ধ বলেন। এটা বলেন কেন? এটা বলার কারণ, আপনারা মসজিদে, মাদ্রাসা, খানকার চার দেয়ালের ভেতরে দাড়িওয়ালা-টুপিওয়ালা, লম্বা পাগড়ীওয়ালা লেবাসধারী মওলানা ও পীর সাহেবদেরকে দেখে মনে করেন এটাই বুঝি ইসলাম। কিন্তু না, এটা প্রকৃত ইসলাম নয়। প্রকৃত ইসলামের অনুসারীরা কখনও স্থবির হতে পারেন না, প্রকৃত ইসলামের চেয়ে বিস্ফোরণমুখী, গতিশীল, বৈপ্লবিক আর কিছু হতে পারে না। তারা কখনও কূপমণ্ডূক নয়, তাদের সংস্কৃতি রুদ্ধ নয়। দুনিয়াজোড়া তাদের দৃষ্টি। তারা নির্দিষ্ট কোনো পোশাকী গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারেন না, কারণ যে জীবনব্যবস্থা এসেছে সারা পৃথিবীর সব ভৌগোলিক পরিবেশের মানুষের জন্য, সেই জীবনব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট পোশাক থাকতে পারে না; ঠিক যে কারণে গণতন্ত্রে বা সমাজতন্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই।

ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা ষড়যন্ত্র করে তাদের সকল উপনিবেশগুলোতে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে একেবারে চূড়ান্ত একটা বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দিয়ে মুসলিম জাতিকে একেবারে বিপরীত দিকে পরিচালিত করছে। এই ইসলাম যে কতটা বিকৃত তার একটি প্রমাণ লেনিনের জীবন থেকে দেওয়া যায়। ঘটনাটি আমরা উদ্ধৃত করছি মাওলানা শামস নাবীদ উসমানী রচিত Now of Never গ্রন্থ থেকে যা অনুবাদ করেছেন স.স.আলম শাহ। অনুবাদ পুস্তক ‘বেদ-কুর’আন ও স্বজাতির বিভেদ’। আরও দেখুন উর্দু পত্রিকা ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ এর ২৮তম সংখ্যা, ১৯৮২, সূত্র: জগদগুরু মুহাম্মদ (সা.), রেনেসাঁ পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা-২০৯-২১০।

ঘটনাটি হলো: রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড লেনিন বিশ্বধর্মের পর্যালোচনা করার পর ইসলামে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি রুশীয় জনগণের ইসলাম গ্রহণের আশা পোষণ করতেন। কথিত আছে যে, জনৈক বাকরা খাঁন নামক বুযুর্গের সংস্পর্শে আসার পর তিনি ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হন। তার দ্বারা লেনিন যথেষ্ট প্রভাবিত হন। যাই হোক, লেনিন সচেষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু মিশরীয় উলামাদের অজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের ষড়যন্ত্রের ফলে এই সুযোগ হাতছাড়া হয়।

রাশিয়ার জার-তন্ত্রের পতনের পর লেনিন হন সর্বময়কর্তা। তিনি কমিউনিস্ট প্রশাসন স্থাপন করেন। একদিন তিনি নিকটতম বন্ধুবর্গের বৈঠক ডাকেন। তাতে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার গঠনে সফল হয়েছি কিন্তু একে সুদৃঢ়, সুবিন্যাস্ত, শাশ্বত ও সার্বজনীন করে তোলার জন্য আমাদেরকে এমন এক জীবনব্যবস্থা দিতে হবে যা হবে মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের শুধুমাত্র অন্নবস্ত্রই যথেষ্ট নয়। আত্মার খোরাকও প্রয়োজন। ক্ষুধার্ত মানুষকে রুটি দিয়ে শান্ত রাখা যায় একটা পর্যায় পর্যন্ত। এ পর্যায় অতিক্রান্ত হলে মানবাত্মা তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠে। এ তৃষ্ণা নিবারণের কোনো উপকরণ-ই আমাদের কাছে নেই। আছে ধর্মাচারের মাধ্যে। আমি পৃথিবীর সব ধর্ম-ই গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছি, সবখানে পেয়েছি আফিমের আবেশ। শুধুমাত্র একটি ধর্মকেই পেয়েছি প্রাণবন্ত জীবনব্যবস্থা হিসেবে। এক অনিরুদ্ধ গতিময়তা এর মধ্যে বিদ্যমান। এটাই আমাদের প্রগতিশীল জীবন ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সহায়ক বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এখন সে ধর্মের নাম আমি শুধু বলব। এ ব্যাপারে মত প্রতিষ্ঠায় আপনারা তাড়াহুড়ো করবেন না। কেননা প্রশ্নটি কমিউনিজমের জীবন মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত (Don’t hasten to form your own conclusions because this question pertains to the life and death of Communism.) আপনারা সময় নিয়ে ভাবনা চিন্তা কোরুন। হতে পারে আমার ধারণা ভুল, কিন্তু আমাদের আত্মপ্রশান্তির জন্য ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। আমি মনে করি যে, ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজতন্ত্রের নিকটতম (Islam is the only religion closer to the economic programmes of Communism.)” এ কথা শুনে সমবেত লোকদের মধ্যে হইচই শুরু হয়ে যায়। তখন লেনিন তাদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন- আজ থেকে পুরো এক বছর পরে পুনরায় আমরা একত্রিত হব। আর তখনই আমরা ঠিক করব কমিউনিস্টদের ধর্মাশ্রয়ী হওয়া উচিত হবে কি না, যদি গ্রহণ করতেই হয় তাহলে সে ধর্ম কোনটি?”
লেনিন
লেনিন

ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর এ সংবাদ অবহিত হয়ে এটাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের অশনি সংকেত মনে করল। তারা ভাবলো, যদি উদীয়মান শক্তি কমিউনিস্ট রাশিয়া এবং বিপন্ন বিপর্যস্ত আধমরা লড়াকু মুসলিম জনগোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে ওপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠবে। সুতরাং ব্রিটিশ কূটনৈতিকরা তৎপর হয়ে উঠল বিশ্বব্যাপী। মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া হল এমন এক সংবেদনশীল প্রশ্ন যে কমিউনিজম হলো আল্লাহবিরোধী মতবাদ। ইসলামের জন্য আল্লাহদ্রোহী এই মার্কসীয় মতবাদ কি গ্রহণীয় হতে পারে? ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে মুসলিম বিশ্বের আলেম ওলামার নিকট থেকে ফতোয়া নেয়া হল। একইভাবে এ প্রশ্নে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল। আলেমগণ এ সংক্রান্ত প্রশ্নের পটভূমি ও এর অর্ন্তনিহিত উদ্দেশ্য অবগত ছিলেন না। ফলে আল-আযহারের ওলামাগণ এরূপ নেতিবাচক বিধান প্রকাশ করলেন যা ব্রিটিশ প্রশাসন একান্তভাবে চাইছিল। অতঃপর যা হবার তাই হলো। ব্রিটিশ সরকার এ ফতোয়া ছাপিয়ে সারা বিশ্বে বিলি করল। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অনেক এলাকায় মুসলিমদের অনেকের কাছে এ ফতোয়ার কপি রয়েছে। এ সংবাদ লেনিনও অবগত হলেন। এতে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন- ‘আমার ধারণা ছিল মুসলিমরা কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রমাণ করল, অন্য আর সব ধর্মাবলম্বীদের মতো মুসলিমরাও গোঁড়া, তত্ত্বসর্বস্ব ও সংকীর্ণ।’ ফলশ্রুতিতে পরিকল্পনা অপূর্ণ থেকে গেল আর লেনিন বিরোধীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

সেদিন লেলিনের এই প্রস্তাব আলেমরা নিতে পারেন নি। কারণ, তখন মদীনা, কায়রো, লাহোর, দিল্লী, কলকাতা ইত্যাদি জায়গায় যে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ব্রিটিশ পণ্ডিতদের তৈরি করা সিলেবাস মোতাবেক যে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া হোচ্ছিল (এবং এখনও হচ্ছে) সেটি আদৌ আল্লাহ-রসুলের ইসলাম নয়। সেই ফতোয়া দানকারী ধর্মব্যবসায়ীরা ছিল কূপমণ্ডূক মোল্লা যারা প্রকৃত ইসলামের সাথে সম্পর্কহীন। স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব প্রত্যাখ্যান করে তারা ব্রিটিশ বেনিয়াদের তৈরি মতবাদ ও সার্বভৌমত্ব তারা মেনে নিয়েছে। আজও পৃথিবীময় ধর্মব্যবসায়ীদের পণ্যরূপী সেই অন্তঃসারশূন্য, স্থবির ইসলামকেই আপনারা দেখছেন এবং অনর্থক আল্লাহ-রসুলের প্রতি বিদ্বেষ লালন ও বিস্তার করে যাচ্ছেন।

সেদিন মুক্তমনা মানুষ লেনিনের পুরো রাশিয়ার জনগোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে ইসলামকে সহায়ক ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণকে যে ধর্মব্যবসায়ীরা নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাদের মনোভাব ছিল অনেকটা এমন- ঐ ব্যাটা তো নাস্তিক, কাফের। ওকে ইসলাম ধর্মের বিধান ব্যবহার করতে দিলে তো ইসলামের জাত যাবে। আজও একই ধারণা ধর্মজীবীরা পোষণ করেন। তাদের জানা দরকার আল্লাহর রসুলের সময় রসুল যখন প্রকৃত ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছিলেন তখন তাঁর আহ্বানে ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাস্তিক, মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক সব জাতির মানুষ ইসলামের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এমন কি রসুলাল্লাহ খ্রিষ্টান শাসক নাজ্জাশির মৃত্যুর পর সাহাবিদেরকে বলেছিলেন যে, তোমাদের একজন ভাই মৃত্যুবরণ করেছেন। রসুলাল্লাহ নিজে তার জানাজার সালাহ কায়েম করিয়েছিলেন। কারণ নাজ্জাশি রসুলাল্লাহর আসহাবদেরকে অকপটে সহযোগিতা করেছিলেন। আমাদের বিশ্বাস লেলিনের উদ্যোগ গৃহিত হলে রাশিয়াতে কমিউনিজমের যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হওয়ার যে দুর্বিসহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তা না হয়ে রাশিয়ার ইতিহাস হতো ভিন্ন ও অনন্য।

১৯৯০-তে সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় মার্কসবাদীদের তীর্থভূমি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়, তারপরই সারা দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র নিক্ষিপ্ত হয় আস্তাকুঁড়ে। সে সময়ের গোঁড়া সমাজতান্ত্রিকরা আজও দুর্বল কণ্ঠে সমাজতন্ত্রের জয়গান করেন কিন্তু বাস্তবে তারা সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা মার্কস লেলিনের আদর্শকে বিসর্জন দিয়েছেন এবং বর্তমানে তারা চরম পূঁজিবাদী গণতন্ত্রের অনুসারী। আপনারা পুঁজিপতিদের অধীনে মন্ত্রিত্ব করছেন, রাজনীতি করছেন, শ্রেণিহীন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা বাদ দিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন আর সকল ধর্মের পুরোহিতরা যেমন ধর্মকে বিক্রী করে জীবিকা নির্বাহ করেন আপনারাও মার্কস, লেনিন, এঙ্গেলসকে বিক্রী করছেন। আপনারা খামোখা মানুষদেরকে সাম্যবাদের কথা বলে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। আপনারা জানেন যে, আপনাদের সিস্টেম ব্যর্থ ও অচল। এখন গণতন্ত্রের দিন এসেছে, তাই সেদিকেই এখন ছাতা ধরে আছেন। এই কথিত পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের অধীনে থাকায় আপনাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত জীবন ঋষ্টপুষ্ট হচ্ছে।

আপনারা যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন আপনাদের প্রতি আমাদের শেষ কথা হলো, যদি আপনারা সত্যিই মানুষের কল্যাণ চান, তবে আপনাদের উচিত প্রকৃত ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা যেটা প্রচণ্ড, দুর্দান্ত গতিশীল এক জীবনব্যবস্থা। সেটা মোল্লাদের কাছে নেই, সেটা আল্লাহ দয়া করে হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। সেটা প্রতিষ্ঠিত হলে পৃথিবীতে থাকবে না কোনো ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ, থাকবে না ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ, শ্রেণিবৈষম্য, পুরো মানবজাতি হবে এক জাতি। মানব সমাজে এমন অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে যে, প্রত্যেকের নিজের মেধা ও পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থের উপর যেমন পূর্ণ অধিকার থাকবে, অপরপক্ষে সমাজের প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল হয়ে যাবে, মানুষ তো দূরের কথা একটি কুকুরও বুভুক্ষ থাকবে না। ধনীর সম্পদে দরিদ্রের ন্যায্য অংশীদারত্ব থাকবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার হাতে মজুরি অর্পিত হবে। মালিক ও শ্রমিক এক টেবিলে বসে খাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য লাইসেন্স লাগবে না, মিথ্যা না বলে যত খুশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা যাবে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের আঞ্চলিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকবে, সঙ্গীত, নাট্য, চিত্রকলায় কোনোরূপ বাধা আরোপ করা হবে না, কেবলমাত্র যা কিছু মানুষের ক্ষতির কারণ হয় সেগুলি বর্জনীয় বলে বিবেচিত হবে। আমরা বলি না যে, আপনারা আল্লাহ বিশ্বাসী হয়ে যান, মো’মেন হয়ে যান, পরকালে বিশ্বাসী হয়ে যান। আল্লাহর প্রতি কে ঈমান আনবে কে আনবে না সেটা তারা আল্লাহর সঙ্গে বুঝবে। সুতরাং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করানো আমাদের কাজ নয়, আমাদের কাজ আল্লাহর শেষ রসুলের আনীত আকাশের মতো উদার, সমুদ্রের মতো বিশাল, দুর্দান্ত গতিশীল ইসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে মানবজাতিকে শান্তিময়, নিরাপদ, ন্যায় ও সুবিচারে পূর্ণ একটি জীবন উপহার দেওয়া। দল, মত, পথ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, আস্তিক, নাস্তিক নির্বিশেষে সকল মনুষ্য সন্তানের প্রতি আমাদের একটিই প্রশ্ন, আপনি মানবজাতির সার্বিক জীবনে সুখ, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি ও ন্যায় চান কি না। যদি চান, তাহলে অন্য কারও কথায় প্রভাবিত না হয়ে জানুন আমরা কী বলি।
(আংশিক সম্পাদিত)


লেখক: রিয়াদুল হাসান,
 দৈনিক বজ্রশক্তির সাহিত্য্য বিষয়ক সম্পাদক ও হেযবুত তওহীদের সদস্য।

খোকা তুই চুপ করে থাকিস !


ছোটবেলায় যখন বালু দিয়ে ঘর বানিয়ে খেলছিলাম,
চৌধুরী বাড়ির সমবয়সী জাম্বো ছেলেটা এসে বালুর ঘরটা ভেঙ্গে দিলো । আমি রাগে গড়গড় করছিলাম । ছোটো খাটো ঝগড়া শুরু করে দিলাম ।
মা, তুমি রান্নাঘর থেকে এসে আমাকেই চড় মেরে অপক্ক গালটা লাল করে দিয়েছিলে ।
রাতে ব্যাথায় ঘুম আসছিলোনা । তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে, যেখানে চড় মেরেছিলে সেখানে চুমু দিয়ে বলেছিলে, খুব লেগেছে খোকা?
আমি ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, আগে জাম্বোইতো আমার ঘর ভেঙ্গে দিয়েছিলো!
মায়ের প্রতি খোকার অভিযোগ
মায়ের প্রতি খোকার অভিযোগ

তুমি বলেছিলে মা, আমি জানিতো আমার খোকা মোটেই ওরকম নয় । কিন্তু কী করবি খোকা ! ওর বাবা যে এলাকার মাথা । তাছাড়া ঋণ. . .

জানো মা, আমার ছোট মাথায় সেদিন এতোকিছু ঢুকেনি । শুধু বুঝেছিলাম, দোষতো আমার ছিলোনা ।

প্রাইমারিতে যখন পড়তাম, কয়েকটা ছেলে মিলে আমাকে মেরে নাক থেকে রক্ত বের করে ফেলেছিলো । আমার দোষ ছিলো, তারা আমার পরীক্ষার খাতাটা জোর করে নিয়েছিলো আর আমি স্যারকে বলে দিয়েছিলাম বলে !
মা তখন তুমি বলেছিলে, ওদের সাথে লাগিস না খোকা, চুপ করে থাকবি !

যখন আমি ফুটবল খেলতে গেলাম পাশের গ্রামের ছেলেদের সাথে, ওরা আমাকে আচ্ছা মতো পিটিয়েছে । কারণ আমি ফাউল করিনি, অথচ ওরা সবাই বলেছে তুই ফাউল করেছিস ! আমি শুধু সত্যটা বলতে গিয়েই. . .
এবার মা তুমি বললে, ওদের সাথে খেলতে যাস কেনো? যা মার খা গে!
আমি এবার আর বললাম না, মা আমি তো সত্যিই ফাউল করিনি!

শহরের কলেজে ভর্তি হলাম । আমি গাঁয়ের ছেলে । শহরের সহপাঠীরা আমাকে দাম তো দিতোই না, বরং এড়িয়ে চলতো, ভাব নিতো । একদিন কলেজ গেটে ঢুকতে গিয়ে একজনের পা খিঁচে ফেলেছিলাম না দেখে । সঙ্গে সঙ্গে সরিও বলেছিলাম । কিন্তু সেই একক্লাস জুনিয়র ছেলেটা আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে তার ছাত্ররাজনীতি দলের বড়ভাইদের সাথে অনেক চড় থাপ্পর মেরেছিলো । সে বলেছিলো আমি নাকি ইচ্ছে করে খেঁচে দিয়েছিলাম । আর ক্ষুর দেখিয়ে এটাও বলেছিলো, কাউকে বললে এরপরে. . .
মা, তখন আমি মেসে এসে অনেক কেঁদেছিলাম । তবু কিভাবে জানি জেনে গেলে! মোবাইলেই বলেছিলে, খোকা, ওদের সাথে লাগতে যাস কেনো । নিচ মুখে কলেজে যাবি আর নিচমুখে মেসে ফিরবি । আর খোকা তুই চুপ করে থাকিস ! কাউকে কিছু বলিস না ।

ভার্সিটি ভর্তি হলাম । রাতে বড়ো ভাইগুলো ডেকে আচ্ছা মতো আমাকে নিয়ে মজা করলো । আর আমাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করেছিলো, যাতে আমার আত্মসম্মানবোধ মাটিতে মিশে যায় । অশ্লীলতা-অন্যায় কোনোটাই বাদ যায় নি, ঐ রাতে আমার সাথে করেনি । একসময় তারা ছেড়ে দিলো । রুমে এসে মনে হলো আমি এখন ধর্ষিত ! জানো মা, অনেক কেঁদেছিলাম । তারা রুমে এসে ধর্ষিতকে চা বিস্কিট এনে দিয়ে বলেছিলো, আরে বোকা ছেলে, আমরা তো মজা করলাম । আমি গভীর রাতে কাঁদতে কাঁদতে নিজেকেই বলেছিলাম, ধর্ষণতো মজারই জিনিস!
মাগো, এ কথাটা তোমাকে বলা গেলোনা । এটা বলার কথাও না । তবু বুঝতে পেরেছিলাম । তুমি যেনো আমার কানে কানে বলছিলে, খোকা তুই চুপ করে থাকিস !


জানিনা কোন কারণে হঠাৎ মেয়েটিকে ভালো লাগতে শুরু করলো । একা একাই তাকে নিয়ে লীক-অলীক স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম । আমার ঐ ভালোলাগা পর্যন্তই, মুখ ফুটে বলা আর গেলোনা । বলার আগেই বড় ভাইদের কাছ থেকে রেড এলার্ম এসেছে । তাই আর বলা হলোনা । বরাবরের মতো চুপ করেই ছিলাম ।

সেদিন উদ্ভ্রান্ত হয়ে রাস্তা ধরে হাটছিলাম । ব্যস্ত রাস্তাটা আজ একেবারে ফাঁকা । হরতালতো তাই । হঠাৎ কোত্থেকে যেনো একটা মিছিল এলো । অনিচ্ছাসত্ত্বেও কী করে যেন মিছিলে ঢুকে গেলাম । মিছিলের স্লোগানটাই জানলাম না । পুলিশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেলো । তুমি থানায় এসে আমাকে বন্দী অবস্থায় বলেছিলে, “খোকা, তোকে না কতবার বলেছি, কোন ভেজালে জড়াবিনা, কেউ কিছু বললে চুপ করে থাকবি !”
মাগো, আমি সেদিনও চুপ করে ছিলাম । তোমাকে কী করে বুঝাবো !

অফিস করে বাড়ি ফিরছিলাম । রাস্তায় দেখলাম বখাটেরা আমার বুবুকে ঘিরে উত্যক্ত করছে । আমাকে দেখে বুবু  ভাইয়া, ভাইয়া বলে জোরে জোরে কাঁদছিলো ।  আমি দৌড়ে তার পাশে গেলাম । আমাকে দেখে বখাটেরা মোটেও পালালোনা, বরং পিশাচের মতো দাঁত বের করে হাসছিলো । আমি নম্রভাবে তাদের বললাম, বুঝালাম । কিন্তু তাদের অবস্থান অনড় আর খুব বাজে বাজে গালি দিচ্ছিল । বুবুর গায়ে হাত দিতে শুরু করলো । ঠিক থাকতে পারিনি । দু ঘাঁ বসিয়ে দিলাম । এরপর থেকে আর কিছু মনে নেই ।

আচ্ছা মা, আমাকে ঘিরে সবাই চোখমুখ ফুলিয়ে কাঁদছে কেনো? চারদিকে এতো আগরবাতির সুবাস কেনো? বুবু কোথায়? তাকে যে দেখছিনা ! কার মুখে যেনো শুনলাম, আমি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরেই ঐ পিশাচেরা দৌড়ে চলে গিয়েছিলো । যাক, বুবুর কোনো ক্ষতি হয়নি । তবে আমি যেনো তখন বুবুর চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম, ভাইয়ারে, একি হয়ে গেলো !
একি, বুবু আমার পাশে এসে কাঁদছে কেনো? বুবু, তোমার কিছু হয়নিতো? আচ্ছা তোমরা সবাই কী ! আমি এতোক্ষণ ধরে এতো প্রশ্ন করছি, কিছু বলছোনা কেনো? নাকি আমার কথা শুনছোনা?
ছুড়িকাঘাতে মৃত্যু
এটাই বোধহয় সেই ছুড়ি যার আঘাতে আমি লুটিয়ে পড়েছিলাম
বাড়িতে অনেক লোকের সমাগম । মসজিদের এমামকেও দেখা যাচ্ছে । ব্যাপার কি! আমি অনেকক্ষণ যাবৎ শুযে আছি । একটু উঠতে চেষ্টা করলাম । পারছিনা । মনে হয় লেগে গিয়েছে অথবা অবশ হয়ে গেছে শরীরটা । অনেক চেষ্টা করেও পারলামনা । একটু পর দেখি সবাই আমাকে লাশের খাটের উপর উঠালো । আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে  । আমাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে সবাই ?

আমি চিৎকার করতে চেয়েও করলাম না । কানে ভেসে আসছিলো মায়ের আর্তনাদ । অথচ মনে হচ্ছিলো মা যেনো বলছে, ”খোকা, তোকে নিয়ে যে যেখানেই যাক, তুই চুপ করে থাকিস !”

হ্যা, মা । আমি চুপ করেই আছি । আর প্রতিবাদ করবোনা । প্রতিবাদ করতে নেই । কী লাভ প্রতিবাদ করে !

জানো মা? যেদিন থেকে আমাকে আব্বু আর চাচ্চুরা মিলে মাটির ভিতর ঘর করে দিলো, সেদিন থেকে বেশ সুখেই আছি । এখানে কোনকিছুর জন্য প্রতিবাদ করতে হয় না । এখানেও আমার একটা বুবু আছে । এখানকার মানুষগুলো কেউ পিশাচ না ।  এখানে অনেক সুখ । তবে মাঝেমাঝে বুকের বামপাশটায় ব্যাথা করে । পরে জানতে পারলাম, যেদিন প্রথম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলাম সেদিন ঐ পিশাচেরা নাকি বুকে অনেকগুলো ছুড়ি মেরেছিলো ।

যাক সে সব কথা । তুমি কেমন আছো মা?

লেখক
ইলিয়াস আহমেদ

প্রকৃতি প্রগতিশীল তবে ধর্মে কেন স্থবিরতা?


কালের ইতিহাসে সবকিছুই লেখা হয় না আবার কিছু কিছু জিনিস ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনও পড়ে না। আসলে এসব ইতিহাসও নয়, বলতে গেলে একেকটা বহমান ঘটনার বৃত্তান্ত। তেমনি একটি বৃত্তান্ত হলো- নগরসভ্যতার স্পর্শ পেয়েও কোনো এক সমাজের স্বাভাবিক যুবকটি হঠাৎ করেই গেরুয়া বসনে উধাও হয়ে গিয়েছে। অনেকদিন পর তার মুখ ভর্তি দাঁড়ি-গোঁফ আর মাথাভর্তি চুলের নিথর দেহটি পাওয়া গেলো সমাজ-নগর-দেশ থেকে বহুদূরের কোনো এক গুহায় অথবা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট এক ঝোঁপঝাড়ে। সেই গেরুয়া বসনের যুবকটির কাছ থেকে পৃথিবী কিছুই পায় নি, সমাজ-দেশ-পরিবার তার দ্বারা উপকৃত হতে পারে নি। অথবা এটাও তো আমরা শুনে থাকব, কোনো এক মুদি দোকানদার বাবার সঙ্গে সেই কিশোরকাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার জীবন কাটিয়ে দিয়েছে সেই মুদি দোকান আর সংসারের দেখভাল করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি তার প্রাত্যহিক রুটিন ছিলো একই। দোকান অভিমুখী একই রাস্তায় যাতায়াত। তার দ্বারা পরিবার ব্যতীত মানবসমাজ তেমন উপকৃত হতে পারে নি। আচ্ছা, আমাদের কি মনে আছে ঐ যুবকটির কথা, যে কলেজ পাস করার পর সওদাগরী অফিসে একটা চাকরি পেয়েছিল? তারপর বিয়ে-সংসার। সেই সকাল থেকে বিকেল অবধি একটানা অফিস করার পর ক্লান্ত পায়ে সে বাজার করে বাড়ি ফিরত আর গিন্নী বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকত? আমাদের কি মনে আছে তাদের কথা? সারাজীবন অফিস আর সংসার করে করে বার্ধক্যে বেচারা বিষাদময় হতাশায় ভুগছিল- সারাজীবন সে কী করেছে? না পেরেছে জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে, না তার দ্বারা মানবসমাজ তেমন কিছু উপকৃত হয়েছে। নিজেকে মূল্যহীন ভাবতে ভাবতে একসময় তার চিন্তাভাবনা থেমে যায় চিরতরে।

আবহমান জীবনযাপন আর ইতিহাস থেকে বের হয়ে যুগের হাওয়ায় এবার চলুন একটু ভাসি প্রগতির প্যারাস্যুটে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম উন্নতির ফলে আমরা আজ অনায়াসেই কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতে পারি, অন্যের সংস্কৃতি লালন করতে পারি। সদ্য উদ্ভব হওয়া কোনো সংস্কৃতিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারি। যেখানে সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটতে আগে সময় লাগত শত শত বছর সেখানে বছরে বছরে আমাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, মানদণ্ড ও সামাজিক অনুসর্গ-উপসর্গের পরিবর্তন হচ্ছে। শুধু সংস্কৃতিতে নয়, এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কারণেই মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিক, রোম, পারস্য নামের আজ অঞ্চলভিত্তিক কোনো সভ্যতা নেই। সব সভ্যতা মিলে আজ গ্লোবাল ভিলেজে একাকার হয়ে গেছে। যান্ত্রিক প্রগতির সাথে সাথে পাল্টে গেছে আমাদের চিন্তাভাবনা, ধ্যান-ধারণা। গভীর রাতের পুকুরে ভাসমান আলেয়া আজ অবমুক্ত মিথেন, ঝাঁড়-ফুঁকে আজকাল তেমন একটা বিশ্বাস নেই মানুষের, যতোটা বিশ্বাস আছে একজন ডাক্তারের প্রতি। তাই বলে কুসংস্কারের বিশ্বাসী, ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদ, মানসিক জরাবাতিকগ্রস্থ শ্রেণিটি যে নেই তা কিন্তু না। বরং তাদের সংখ্যাই প্রগতি ও আধুনিক চিন্তাধারার জনসংখ্যার চেয়ে ঢের বেশি। এই যে বৃহৎ এক জনশক্তি যাদের একটু সচেতনতায় পৃথিবীতে নেমে আসত শান্তি, যারা ইচ্ছে করলেই পারত পৃথিবীটাকে সুন্দর করে সাজাতে, যারা ইচ্ছে করলেই পারত স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করতে তারা যেমন মৃত, বিকৃত, কুসংস্কারময় ধর্মকে আঁকড়ে ধরে বুঁদ হয়ে আছে অন্যদিকে যারা অশ্লীল-কুরুচিপূর্ণ পোষাক পরিধান করে, বিবিধ মাদকতা আর উন্মাদনায় ডুবে থাকে, নারী অধিকারের নামে তাকে শোবিজের হাঁটে নগ্ন-পোশাকে উপস্থাপন করে, তার দেহকে বিজ্ঞাপনের সামগ্রী বানায়, উদারতার নামে সমকামিতার কীর্তন করে, অর্থাৎ কথিত প্রগতিবাদীরা তারাও ভিন্ন ধাঁচের জরা-বাতিকগ্রস্থতায় আক্রান্ত। একজন কুসংস্কারে বিশ্বাসী আরেকজন অতি সংস্কারে বিশ্বাসী, একজন ধর্মান্ধতায় বুঁদ অন্যজন ধর্মহীনতায় বুঁদ, একজন আপাদমস্তক আবৃত করার পক্ষে অন্যজন যতদূর সম্ভব নগ্নতার পক্ষে। শান্তিলাভকে যদি উন্নতির মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করা হয় তাহলে কোনটি শান্তিদায়ী। আমি বলব, দুটি শ্রেণির মধ্যে ফলাফলগতভাবে তেমন একটা পার্থক্য নেই। অর্থাৎ দুটো শ্রেণিই ভারসাম্যহীন, পরস্পরের প্রতি চরম বিদ্বেষে ভারাক্রান্ত অন্তর নিয়ে যাদের প্রতিটি দিন কাটে। কথা বলার সুযোগ পেলেই তারা একে অপরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে। তাই আসুন, যারা শান্তি চাই, তারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে উভয়ের থেকে সমদূরত্বে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করি- এই উভয়ের মধ্যে কোনটাকে আমরা গ্রহণ করব- অন্ধত্ব না প্রগতি?
এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ধর্মান্ধতা-কূপমণ্ডূকতা-গোঁড়ামি-সাম্প্রদায়িকতা-কুসংস্কারমনার নামে স্থবিরতা মানবসমাজের গতিময়তাকে রুদ্ধ করে, পথিককে নতুন পথ সৃষ্টি করার প্রেরণা যোগায় না বরং প্রাচীন কানাগলিতে চলার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে, তথা শান্তি প্রতিষ্ঠায় এ সকল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বিষয় কখনই কাম্য নয়। কারণ প্রকৃতি যেখানে নিয়ত গতিময়, পরিবর্তনশীল সেখানে আমরা মানুষ কোন যুক্তিতে অনড়, অচল একটি অবস্থানকে নিয়তির মতো ধরে রেখে স্থবিরতার পরিচয় দেব?
প্রাণিভূগোলে ‘মহাদেশীয় সঞ্চারণ’ (Continental drift) নামে একটা তত্ত্ব আছে, যেখানে সময়ের প্রেক্ষিতে সাতটা মহাদেশের পরস্পর থেকে ক্রমমান দূরে সরে যাওয়ার ব্যাপারটা আলোকপাত করা হয়েছে। এই ‘মহাদেশীয় সঞ্চারণ’ দুয়েক দিনে হঠাৎ করেই সম্ভব হয় নি বা সে অনুযায়ী ঘটছেওনা; সময়ের প্রেক্ষিতে খুব ধীরে সেটা ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে। অর্থাৎ পৃথিবী শুধু আহ্নিক আর বার্ষিক গতিতেই গতিশীল এমনটি নয়, আন্তঃঅভ্যন্তরীণেও চলছে গতিময় পরিবর্তন। পৃথিবীতে অবস্থিত যত সৃষ্টি আছে সব কিছুই গতিশীল। অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে সবকিছু। ইলেকট্রনের প্রদক্ষিণ, আয়নের ছোটাছুটি, কোষের বিভাজন কেনোটাই স্থবিরতার পরিচয় দেয় না। জড় থেকে জীব সবাই তার নিজস্বগতিতে গতিশীল। কেউ থেমে নেই। আপাতদৃষ্টিতে উদ্ভিদকে স্থির মনে হলেও তার অভ্যন্তরীণে মূল থেকে পাতায় পাতায় চলছে শ্বসন, প্রস্বেদন তথা আয়নের ছোটাছুটি, কোষের বিভাজন। অবাত শ্বসন-সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া স¤পন্নে সে সর্বদাই গতিশীল। এককোষী প্রাণী অ্যামিবা পর্যন্ত স্থির নয়, ক্ষণপদ সৃষ্টির মাধ্যমে সে ছুটে চলে জীবনের অস্তিত্ব বজায় রাখতে। সৃষ্টির সেরা মানুষের অভ্যন্তরেও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে জৈবিক গতিময় ব্যবস্থা। হৃৎপিণ্ডের সংকোচন-প্রসারণ, ধমনী-শিরার মাধ্যমে ক্রমাগত রক্তসঞ্চালন, কোষের বিভাজন ও দেহের বৃদ্ধি সবকিছুই প্রকৃতির সদাগতিয়মতার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

শুধু পৃথিবী ও তার সৃষ্টিতেই এই গতিময় অবস্থা বিরাজমান তা নয়, ঐশী গ্রন্থ আল-কুরআনেও বলা হয়েছে, সৃষ্টির শুরু থেকেই মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। আল্লাহ বলেন, “আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমিই এর সম্প্রসারণকারী” (সুরা যারিয়াত ৪৭)। যদিও কয়েক দশক আগে এই তত্ত্বের ধ্যন-ধারণা ও প্রমাণ করেন বিজ্ঞানী হাবল-এর (Hubble) মতো বিজ্ঞানীরা। যে কোনো অবস্থান থেকে দেখলে মনে হবে বাকি সবকিছু পিছিয়ে যাচ্ছে। এই সম্প্রসারণ দূরবর্তী ৩ঈ-২৯৫ গ্যালাক্সির জন্য প্রতি সেকেন্ডে ৯০,০০০ মাইল। যাইহোক, মূলকথা হলো পৃথিবীসহ মহাবিশ্বে যা কিছু আছে সবই সাম্যাবস্থায় পরিণত হওয়ার অভিপ্রায়েই হোক আর অন্য কোনো অবস্থায় পরিণত হওয়ার লক্ষ্যেই হোক, ক্রমবর্ধমান গতিশীল। অর্থাৎ এতেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রাকৃতিকভাবেই পৃথিবীসহ মহাবিশ্বে যা কিছু আছে সবকিছুতেই গতিময় (Dynamic) একটা অবস্থা বিদ্যমান। পার্থক্য শুধু কার্যে-ক্ষেত্রে-ধরণে। কিন্তু সবার লক্ষ্যই যেন এক, অভিন্ন- এক মহা উদ্দেশ্য সাধনে সবাই মহা ব্যতিব্যস্ত- কেউ থেমে নেই।
এ থেকে বুঝা যায়, সৃষ্টিগত ভাবেই আমরা মানুষ গতিশীল। আমাদের অস্তিত্বজুড়ে স্পন্দন । গতিহীনতাই মৃত্যু। তাই জরা-বাতিকগ্রস্থতা, পিছুটান, স্থিতিশীল থাকা আমাদের সাজে না। সে অনুযায়ী স্থবিরতা আমাদের কখনোই কাম্য নয়, প্রগতিই আমাদের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত এবং অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু আমরা ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি বর্তমান সভ্যতায় প্রগতি বলতে যা বুঝায় তা সর্বদাই শান্তিময় ও কল্যাণকর নয়। প্রগতির নামে আজ যা চলছে তা সবই শুধু স্থবিরতার নয় পশ্চাদগামিতার পরিচয় দেয়। যেমন প্রগতিবাদীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে যথেচ্ছ ইন্দ্রিয় উপভোগের স্বাধীনতা, এর মধ্যেই চলে আসে নগ্নতা, অশ্লীলতা, নারীদেহের বাণিজ্যিক ব্যবহার ও প্রদর্শনী, সমকামিতা ইত্যাদির অধিকার। এগুলো কোনটা প্রগতির পরিচয় বা নব আবিষ্কার? এর সবগুলোই সুদূর অতীতের বর্বর অসভ্যতার যুগগুলোতে মানুষ মাড়িয়ে এসেছে। প্রগতির পক্ষে যারা তাদের এটাতো মাথায় রাখতে হবে, প্রগতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য মানবতার কল্যাণ। যে প্রগতি দিয়ে মানবতার কল্যাণ হয় না বরং যার ফলে বিদ্বেষ বাড়ে, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত বাড়ে অপরাধ, ভারসাম্যহীনতা; যে প্রগতি মানুষকে শান্তি দিতে পারে না সেটা কখনই প্রকৃত অর্থ প্রগতি হতে পারে না- সেটা প্রগতির নামে প্রতারণা, পশ্চাদগামিতা। আজ অধিকাংশ মানুষই মনে করছেন, যে যত বেশি আধুনিক যান্ত্রিক প্রগতি ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে সে ততোই সপ্রতিভ, প্রগতিমনা, আধুনিকমনা। তাই যে ফেসবুক বোঝে না, তাকে ব্যাকডেটেড মনে করা হয় আর যে নায়ক-নায়িকাদের অনুকরণে পোশাক-আশাক পরে অষ্টবক্রকলেবর হয়ে নাকমুখ বাঁকা করে স্মার্টফোনে সেলফি তুলে থ্রিজি কানেকশান ব্যবহার করে আপলোড করতে পারে তাকেই আপটুডেট মনে করা হয়। সারাদিনরাত সামাজিক যোগাযোগ সাইটে বুঁদ হয়ে থাকা, বার-পার্টি-কনসার্টে, থার্টিফার্স্ট, ভালোবাসাদিবস, বন্ধুদিবস ইত্যাদিতে মাদকসেবনের পাশাপাশি রাতবেরাত বন্ধু-বান্ধবীর সাথে আড্ডা দেয়া, ডেটিং করা (বিস্তারিত না বললেও চলবে), ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে টিভির সামনে বসে খেলা-সিনেমা-সিরিয়াল দেখা, ঘরে কিংবা সাইবার ক্যাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কম্পিউটারে গেম খেলা, সানগ্লাস আর থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে অস্বাভাবিক গতিতে বাইক চালিয়ে নায়কত্ব দেখানো, মুখে বাংরেজি বুলি ও খিস্তি-খেউড়, ইভটিজিং করা প্রভৃতি আধুনিক ও প্রগতিমনার অন্যতম শর্ত। আরেকটু আধুনিক হতে হলে এগুলোর পাশাপাশি ধর্মকে গালিগালাজ করতে হবে। যে যত বেশি এগুলোর সাথে আপডেট সে তত আধুনিক, তত স্মার্ট, তত প্রগতিশীল। কিন্তু আসলেই কি তাই? না। এগুলো আধুনিক যুগের অন্ধত্ব।
প্রতিটি জিনিসের ভালো মন্দ নির্ভর করে তার ব্যবহারের উপর। একটা মোবাইল বা কম্পিউটারের আবিষ্কারে কোনো দোষ নেই, বরং আশীর্বাদ। এই যান্ত্রিক প্রযুক্তিকে যতক্ষণ মানবকল্যাণে ব্যবহার করা হবে ততক্ষণ সেটা প্রগতির পরিচয় দেবে কিন্তু যখনই সারা দিনরাত কেউ অপ্রয়োজনে টিভি-কম্পিউটার-ইন্টারনেট-সামাজিক যোগাযোগ সাইটে বুঁদ হয়ে থেকে তার জীবন থেকে মূল্যবান সময়-শ্রম নষ্ট করে, অনুৎপাদনশীল, স্থবির, গতিহীন হয়ে বসে থাকবে তখন সেটা সার্বিক দিক দিয়ে কখনই প্রগতিশীলতার পরিচয় দেয় না। বরং সেই যান্ত্রিক প্রগতি তখন সার্বিক অধোঃগতির পরিচয় বহন করে। তাই যান্ত্রিক প্রগতির সাথে সার্বিক প্রগতিকে গুলিয়ে ফেলাটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল। যান্ত্রিক প্রগতিকে যদি আমরা সার্বিক প্রগতির লক্ষ্যে ব্যবহার করতে চাই, তবে এমন কিছু সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ আমাদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে যা আমাদের মন ও দেহের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ। এটা ভুললে চলবেনা যে, আমরা যন্ত্র নই, আমরা আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে মানুষ। যদি আত্মা না থাকত তবে আমরা পুরোপুরি যান্ত্রিক প্রগতির উপর নির্ভরশীল হয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাতে পারতাম। কিন্তু আমাদের আত্মা সবসময় কর্মপালনে ব্যস্ত থাকতে চায় না, আত্মা নির্দিষ্ট সময়ে নীরবতা চায়, চিন্তা ও কল্পনা করতে চায়। বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতায় ডুবে থেকে ক্লান্তি-শ্রান্তির পর অবশেষে পাশ্চাত্য দেশগুলোর মানুষ বুঝতে সক্ষম হয়েছে যে, আমরা আসলেই শুধু দেহনির্ভর নয়, আমাদের আত্মা বলেও কিছু একটা আছে। সেই আত্মিক প্রশান্তির জন্য তারা বেছে নিয়েছে বিভিন্নরকম মেডিটেশন পদ্ধতি ও ধর্মান্তরিত হওয়ার সংস্কৃতি।

অতএব সিদ্ধান্ত এই দাঁড়ালো যে, মানবকল্যাণের লক্ষ্যে যে যান্ত্রিক প্রগতি সেটাকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতে হবে। আর সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হলো, আমাদের দেহ ও মনের সাথে যা ভারসাম্যপূর্ণ তথা স্রষ্টার দেয়া জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, যান্ত্রিক প্রগতির স্রষ্টা ও মালিক মানুষ নিজেই। কারণ, স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির মাঝে কেবল মানুষকেই জ্ঞান নামের অমূল্য এক সম্পদ দান করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি আদমকে শিক্ষা দিলে সমস্ত বস্তুর নাম (সুরা বাকারা ৩১)। সেই জ্ঞান কী করে ব্যবহার করতে হয় সেটার জন্য তিনি দিয়েছেন বুদ্ধি-বিবেক। আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আল্লাহ তাকে জানালেন কোনটি তার জন্য ভুল এবং কোনটি সঠিক” (সুরা শামস ৮)। আর আমরা মানুষতো শুধু আল্লাহর দেওয়া অকল্পনীয় শক্তিশালী মস্তিষ্কটি খাটাচ্ছি আর পরিশ্রম করেছি, স্রষ্টাও তাই চেয়েছেন। ঐশী গ্রন্থ কোর’আনে তিনি বলেছেন, “আমি (আল্লাহ) মানুষকে শ্রমনির্ভরশীল করে সৃষ্টি করেছি” (সুরা বালাদঃ ৪)।
নদীর স্রোতধারা, ঝর্ণার প্রবাহ, সমুদ্রের ঢেউ, মেঘের বৃষ্টি, রৌদ্রের প্রখরতা, সূর্যের উদয়াচল থেকে অস্তাচল প্রত্যেকেই তার নিজস্ব জগতে গতিশীল (Dynamic), কিন্তু মহা উদ্দেশ্য সাধনে সামষ্টিকভাবে প্রত্যেকেই অবদান রেখে চলেছে। প্রত্যেকের এই গতিময় অবস্থাই তাদের স্ব স্ব প্রগতির পরিচয় দেয়। তারা স্থির নয়, তারা থেমে নেই। তাদের মাঝে নেই জরা-বার্ধক্য-কূপমণ্ডূকতা-গোঁড়ামির মতো স্থবিরতা। কারণ বার্ধক্য তো তা-ই, মৃত্যু তো তারই হয় যে অনুৎপাদনশীল (Unproductive), যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো কিছুই রেখে যেতে পারে না। যে কেবলমাত্র নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রচেষ্টা করে, আত্মকেন্দ্রিকতায় বুঁদ থাকে সে কখনোই প্রগতিবাদী হতে পারে না, সে স্থবির-জরাবাতিকগ্রস্থতায় যে আক্রান্ত হয়ে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর যারা পরার্থে আত্মত্যাগ করে তারাই প্রগতিবাদী তারাই শহীদ, তাদের কোনো মৃত্যু নেই। অমরত্বের আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন। অমরত্বের আকাঙ্খায় আদম (আ.) ও মা হাওয়া গন্দম খেয়েছিলেন। আমরাও চাই অমর হতে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে, ইতিহাসের পাতায়, আমাদের কীর্তির মন্দিরে। কিন্তু সেই অমরত্বের পথ সবার ভাগ্যে জোটে না। সেই সুযোগ পৃথিবীতে আবার সৃষ্টি হয়েছে। আসুন, মানবকল্যাণকে সামনে রেখে সকল ধরণের জরা-বার্ধক্য-কূপমণ্ডূকতা-কুসংস্কার-গোঁড়ামি-ধর্মান্ধতা-অন্ধবিশ্বাস-একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি ডিঙ্গিয়ে ঝরনার মতো উদ্দাম ও তটিনির মতো চঞ্চল হই। ধর্মের নামে স্থবিরতা নয়, নয় প্রগতিবাদী ভুতের উল্টোমুখী গতি, আসুন সত্যিকার প্রগতিবাদী হই।



লেখক,
ইলিয়াস আহমেদ


(দৈনিক বজ্রশক্তি পত্রিকায় ছাপানো)

একটি পেট্রোল বোমার গল্প


একটি পেট্রোল বোমার গল্প

আমি পেট্রোল বোমা, শান্তিকামী মানুষের কাছে চরম ঘৃণ্য এক বস্তু । জানি এ ঘৃণা নিয়েই আমাকে আজীবন বেঁচে থাকতে হবে । একটু আগেও আমি নিরাশ বা হতাশাগ্রস্থ ছিলামনা এই ভেবে যে, একটা পক্ষ আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে । ভালোবাসে তারা আমাকে প্যান্টের পিছনের পকেটে রাখে । যে পকেটে মানিব্যাগ, প্রিয়তমার উপহার রুমাল-ফুলের মতো দামি দামি জিনিসের ঠাঁয়, সেখানে আমার আজকে অতিসাবধানী অবস্থান । তবুও আজকে আমি আমার সকল অহমিকা মাটিতে ধূলিস্মাত করে  আপনাদের দ্বারস্থ হয়েছি । বলতে খুব লজ্জা লাগলেও তবু বলতে হচ্ছে- যে পেট্রোল বোমা রাতের আঁধারে যানবাহনের উপর নিক্ষিপ্ত হয়ে সব জ্বালিয়ে অঙ্গার করে  দেয়, আকাশে-বাতাসে ধ্বংসলীলা চালায়, যার বিস্ফোরণে বাংলার আকাশ ২৫ শে মার্চের ন্যায় লাল-আঁধারিয়ার রূপ নেয়, যার ঔদ্ধ্যতায় বার্ণ ইউনিটে চলে শোকের মাতম, একেকটা মানবদেহের উপর জারি হয় সমন, সেই পেট্রোল বোমাই কিনা আজ ভয়ে দিনকাল কাটাচ্ছে ! জানি, আমার মতো পিশাচের মুখে এমনটি মানায় না । হয়তো আপনাদের খুব হাসি পাচ্ছে । না, এ আমার কোনো ছল-চাতুরী নয়, নয় প্রতারণা, উপহাস, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য । সত্যিই আমি আজ খুব ভীত । হে বিশ্বমানব,  আমি মোটেই এমনটি ছিলাম না । কালের গর্ভে আমাকেও একদিন চলে যেতে হবে ।  তাই চলে যাবার আগে আপনাদেরকে সত্যটা জানিয়ে যেতেই হবে । নইলে পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় আমার নামটা যতোটা না ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করা হবে, তারচেয়ে শতগুণ আমাকে অভিশাপ পেতে হবে আপনাদের কাছ থেকে । আজ শোনাতেই হবে আমার জীবনের আত্মকথা ।
একটি পেট্রোল বোমার গল্প
পেট্রোল বোমা


প্রাগৈতিহাসিক হওয়ার পরেও পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের অস্তিত্ব। ভূগর্ভস্থে বেশ সুখে শান্তিতে পরিবারস্থ সবাই মিলে অবসর জীবনযাপন করছিলাম । তখনও পৃথিবীর মানুষ আমাদের নামকরণ করেনি । করবে কী করে? তখনো তো আমাদেরকে তারা আবিষ্কারই করতে পারেনি ।  বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের চিন্তাভাবনা, বুদ্ধি-বিবেক, আবিষ্কার ও প্রায়োগিক ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার পর যান্ত্রিক সভ্যতার সূচনালগ্ন হিসেব তারা প্রথমে আবিষ্কার করে চাকা । অতঃপর কোনো এক রৌদ্রময় দুপুরে বিশ্বসভ্যতায় হাজির হয় ইঞ্জিন নিয়ে । সময়ের প্রেক্ষিতে সেই ইঞ্জিনের মধ্যেও বেশ পরিবর্তন আসে । যখন ভূগর্ভস্থ ভেদ করে আমাদেরকে বের করে এনে আবিষ্কার করলো আমরা দাহ্য এবং  ইঞ্জিনের জন্য উত্তম এক জ্বালানি, সেদিন থেকেই পৃথিবীর মানুষের কাছ থেকে আমরা সুন্দর একটা নাম পেলাম- ‘পেট্রোল’ । আপনাদেরকে বুঝাতে পারবোনা সেদিন আমরা কতটা খুশি হয়েছিলাম । একে তো, মহান  স্রষ্টা আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে আমাদের অলসতা থেকে রক্ষা করেছেন, তার উপর সুন্দর একটা নাম পাওয়া, চারটি খানি কথা নয় । এ আনন্দে কয়েক শতাব্দী ধরে আমরাসহ আমাদের স্বজাতিরা সবাই একনিষ্ঠভাবে মানুষের গোলামি করে চললাম । দিন নেই, রাত নেই, ইঞ্জিনে পিষে, পুড়ে আমাদের যৌবন নিঃশেষ করে দিচ্ছি । মানবতার কল্যাণে  স্বার্থত্যাগের দৃষ্টান্তদের মধ্যে আমরাও ছিলাম, যদিও সে স্বীকারোক্তি করে পৃথিবীর ইতিহাস কাগজ-কলম খরচ করার সাহস রাখেনা ।  তবুও আমাদের বিন্দুমাত্র আফসোস নেই, নেই কোনো ক্ষোভ কিংবা প্রতিদান পাবার খায়েশ। কারণ  স্রষ্টার আদেশে আমরা যে, তার এক সৃষ্টির দাস হয়েছি। তাই আপাতত মনিব বলতে এই মানুষই আমাদের প্রভূ । স্বার্থত্যাগ আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্পগুলো এভাবে চলছিলো । কিন্তু আমাদের এই প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় হঠাৎ এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসলো । এরকমটি করতে আমরা একরকম বাধ্য হলাম । যে সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো এটা উপরতলা থেকে আসেনি । আমাদের আপাত মনিব খোদ মানুষগুলো অদ্ভূতভাবে আমাদের উপর এক অন্যায় চাপিয়ে দিলো । যাদেরকে এতো বুদ্ধিমান মনে করতাম, স্রষ্টার ঘোষিত ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ পদবীতে  ভূষিত মানুষগুলো আমাদেরকে যে কাজে ব্যবহৃত করার সিদ্ধান্ত নিলো তার জন্য আমরা বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলাম না । পেট্রোলের পরিবর্তে আমাদেরকে ‘পেট্রোল বোমা’ হয়ে কাজ করতে হবে । অমানবিক সিদ্ধান্ত দেখে আমাদের পরিবারস্থ সবাই খুব আশ্চর্য্য হলো । কিন্তু কিছুই করার ছিলোনা ।
পুলিশের দিকে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমা
পুলিশের দিকে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমা

আমার জন্মটা ঠিক কখন সেটা আজও ঠাওর করে উঠতে পারিনি । তবে প্রথম দিকের অনেক কিছুই আজও চোখে ভাসছে ।  সময়টা ১৯৩৬-৩৯ সাল । স্পেনে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা এতোদূরেই চলে গিয়েছে যে, ন্যাশনালিস্ট আর রিপাবলিকানদের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব-বিরোধ । তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে এসে গড়ায় ।  ইতিহাসে যেটাকে ‘স্প্যানিশ সিভিলিয়ান যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করে । সর্বপ্রথম এ যুদ্ধে মানুষ প্রায়োগিক জন্ম দেয় আমার অর্থ্যাৎ পেট্রোলবোমার । এ যুদ্ধে ন্যাশনালিস্ট আর রিপাবলিকান দুপক্ষই পেট্রোলবোমার ব্যবহার করে । যখন ব্যবহারকারীরা দেখলো আমি দামে সস্তা, আমাকে বানাতে সহজ অথচ খুবই কার্যকরী তখন থেকেই আমার কদর ক্রমশ বেড়ে যায় । তাই আমি বারবার বিস্ফোরিত হয়ে বার বার জন্ম নিই । আমার এ পূনর্জন্মে কতক মানুষ খুবই সুখী আর বেশির ভাগই মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ১৯৩৯ সালে মঙ্গোলিয়া আর মাঞ্চুকোদের মধ্যে যখন সীমান্ত নিয় সমস্যা হচ্ছিলো তখন আবার আমাকে জন্ম নিতে হয় পেট্রোল বোমা হয়ে । ঐ একই সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ বাহিনীরা যখন ট্যাংক নিয়ে ফিনল্যান্ডের অভিমুখে আসছিলো তখন ফিনল্যান্ডের সৈন্যরা নিরুপায় হয়ে আমাকে পূণর্জন্ম দিলো । কারণ ঐ ট্যাংকগুলো ধ্বংস করার আপাত এরচেয়ে ভালো বুদ্ধি তখন ছিলোনা । ফের আমাকে যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় । তবে এ যুদ্ধের নাম 'Winter War'.  যখন দেখলো ফিনল্যান্ডের সৈন্যরা আমার যথার্থ ব্যবহারে সোভিয়েতের ট্যাংকগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম হলো, তখন আমার নাম-ডাক বাতাসের সাথে পৃথিবীর ওপার থেকে এ পারে ভেসে যেতে লাগলো ।  যার ফলে ১৯৪০ সালে ব্রিটিশরা আমাকে নিয়ে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করলো । অর্থ্যাৎ আমি পেতে চললাম ইংল্যান্ডের রাজকীয় সম্মান । এর পরে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি । ১৯৫০-৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে লাল বাহিনী অর্থ্যাৎ কমিউনিস্ট সৈন্যদের বিরুদ্ধে অ্যান্টি কমিউনিস্টরা আমাকে ব্যবহার করলো ।
Winter War- এ ব্যবহৃত পেট্রোল বোমা
Winter War- এ ব্যবহৃত পেট্রোল বোমা

অর্ধপৃথিবীর বেশি জায়গা জুড়ে যখন সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি তন্ত্রমন্ত্রের ধ্বস নামে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, ঠিক তখন থেকে আমার প্রয়োজনীয়তা কমতে শুরু করে । আমি তো ভেবেই বসেছিলাম, আমার বোধহয় আর পূণর্জন্ম হবেনা, ফিরে যেতে হবে আদি অবস্থায় । সেই কলকারখানা, সেই ইঞ্জিন । কিছুদিন পরে দেখলাম, আমার ধারণা ভুল । বাংলাদেশের মতো যেসব অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সে দেশগুলোতে কয়েক বছর পরেই সৃষ্টি হয় জাতীয়গত বিভাজন । এ বিভজান গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে । একসময়ের ঐক্যবদ্ধ বাঙ্গালি জাতিটি গণতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে বহুদলীয় দলে-উপদলে বিভক্ত জাতিতে পরিণত হয় । রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, হিংসা, ক্ষমতার লোভে শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ জিয়াউর রহমানের মতো দেশের অন্যতম দেশপ্রেমিক নেতা-নেত্রীদের হত্যা করা হয় । একের পর এক নির্বাচন শেষে দেশ আদর্শিক চেতনায় বহুভাগে বিভাজিত সৃষ্টি হতে শুরু করলো । গত ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে পর থেকেই এদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ক্রমশ খারাপের দিকে অগ্রসর হওয়ায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা ষোলো কোটি মানুষ, কিন্তু প্রস্তুত ছিলাম আমি পেট্রোল বোমা । কারণ আমি কালের সাক্ষী । আমি দেখেছি একটা জাতি কী করে অন্যজাতির বিরুদ্ধে কত নিষ্ঠুর হয় ! কী করে পারে বিপক্ষের সৈন্যসামন্তকে । কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট আশ্চর্য্যবোধ করছি । আশ্চর্য্য হয়েছি এ কারণেই যে, একই দেশে বসবাস করে, একই পাড়ায় দিনরাত্রি যাপন করে । অথচ কেবলমাত্র আদর্শিক দ্বন্দ্ব-বিরোধিতার সূত্র ধরে এরা একে অন্যের কী সর্বনাশটাই না করছে ! গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে প্রতিটা দলই হরতাল-বিক্ষোভ-পিকেটিং করে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি করেছে আর এখনও করছে, ভবিষ্যতেও করবে । কেউ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে, কেউ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে, কেউ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে সাধারণ মানুষের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে । রেহায় পাচ্ছেনা দুধশিশু থেকে শুরু করে প্রায় অর্ধমৃত বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ।  দেশে রাজনৈতিক ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে কিছুদিন আগে আমার দুঃসম্পর্কের আরেক জাত ভাই ‘ককটেল’ ব্যবহার করা হয়েছিলো । কিন্তু আন্দোলনে তৃপ্তি না পাওয়ায় অবশেষে ইতিহাস থেকে বাছাই করে আমাকে আবারো আমন্ত্রণ জানানো হলো ।

আমন্ত্রণ জানানোর আগ পর্যন্ত আমিও অন্যসব পেট্রোলের মতো নিরীহ, মানবতাবাদী, স্বার্থত্যাগী দাহ্য, তৈল ছিলাম । কিন্তু আজ রাতে মনিব আমাকে বলে গিয়েছে, আজকের পেট্রোল আগামীকাল ভোররাতে পেট্রোলবোমায় পরিণত হবে । মনিবের এমন কথায় প্রতিদিনের মতো আমার মনে প্রফুল্ল লাগছিলোনা । ভেবে খারাপ লাগছিলো এ কারণে যে, এতোদিন তো মানবকল্যাণে কাজ করেছি । আর আজকের এই ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে আমি জড়িত হবো? মনিব হয়তো  আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরেছিলো । তাই অতি সুকৌশলী হয়ে আমাকে বলেছিলো,

-তুইতো দেখছি আস্ত বোকা ! আরে এটাও তো মানবকল্যাণ মূলক কাজ । বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্রত্যাগ ।

-মনিব, আমি ঠিক বুঝলামনা?

-আমরা যদি ক্ষমতায় যাই, তবে দেশের মানুষ সুখী হবে । বুঝলি? যে করেই হোক, এই জুলুমবাজ সরকারকে, দলকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া যাবেনা । পেট্রোল বোমার আঘাতে যদি গুটি কয়েক মানুষ মরে তো মরুক । হরতাল-পিকেটিং করে, ককটেল বোমায় আতংক সৃষ্টি করে, পেট্রোল বোমায় মানে তোকে দিয়ে মানুষ হত্যা করে যদি দেশে আমরা ক্ষমতায় গিয়ে শান্তি স্থাপন করতে পারি তবে ক্ষতি কী?  তাছাড়া, তুইতো এতদিন কারখানায়, ইঞ্জিনে জ্বলে-পুড়ে কয়লা হয়েছিস । আজ সুযোগ এসেছে নিজের শক্তিমত্তাকে প্রকাশ করার ।  আজ সুযোগ এসেছে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করার । যে মানুষগুলো তোকে নিযে এতোদিন খেলেছে, পিষ্ট করে মেরেছে তার প্রতিশোধ নেবার সময় এসেছে । তুই আজ থেকে ধ্বংসের আরেক নাম । মহাপ্রলয়ের অঙ্গীকার ।

মনিবের এমন জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে আমি সেদিন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি । এরকম ভাষণ তো এর আগে কেউ দিতে পারেনি ! লাল চামড়ার স্প্যানিশ, ফিনিশদের খাকী পোষাকধারীরা কেউ পারেনি ! অথচ বাংলাদেশের মনিব এ কি শোনালো আমায় !  বুকের ভিতরে তখন থেকেই বিদ্রোহের আগুণ জ্বলতে শুরু করছে। মনের ভিতর সুপ্ত পশুত্ব সেদিন জেগে উঠে আমার হিতাহিতবোধ লোপ পাইয়ে দিয়েছিলো । মনিব একটা কাঁচের বোতলের মুখ খুলে অপেক্ষা করার আগেই আমি অতি সোৎসাহে ঢুকে গেলাম । তারপর সেই বোতলে অনেকগুরো ভগ্ন মার্বেল ও আরও কী কী জানি রাখলো । মুখে একটা সলতে ঢুকিয়ে দিয়ে বেশিরভাগ অংশটা বের করে রাখলো যাতে সেখানে আগুন জ্বালানোর সাথে সাথে আমি বিস্ফোরিত হই অহংকারে ।

আজকের রাতটা যেনো পারই হচ্ছেনা । আমি উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি কখন মনিব এসে আমাকে বিস্ফোরিত করে । অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হলো । শেষ রাতের দিকে । তখনও ফজরের আযান দেয়া হয়নি । পাকা রাস্তার লাইট পোষ্ট গুলোতে আলো জ্বলছে । রাতের আকাশের তারাগুলো মিটমিট করে কী যেনো ভিডিও করছে । ইতোমধ্যে আমার মনিব আরো কয়েকজন  স্বজাতি মনিবকে নিয়ে এসে হাজির । তারাও আমার মতো আরো অনেকগুলো পেট্রোল বোমা নিয়ে এসেছে । এদের কতকগুলো আকারে আমার মতো, কতকগুলো আবার আমার চাইতেও বড় ।
রাস্তার  পাশে একটা বড় আমগাছ । আমিসহ সবাই এটার আড়ালে উৎ পেতে রয়েছি । দূরপাল্লার বাসটি এদিকেই আসছে । রাস্তার ঝোপের অদূরেই একটা শিয়াল লাগাতার হুক্কা-হুয়া ডেকেই চলেছে । হয়তো সে যাত্রীবাহী বাসের ড্রাইভারকে সতর্ক করার জন্য বারবার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । আমার খুব রাগ হচ্ছিল শিয়ালটির প্রতি। ইচ্ছে করছিলো এখনই ওটার উপরই গিয়ে বিস্ফোরিত হই ।
বাসে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমায় আগুণ ধরে যায়
বাসে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমায় আগুণ ধরে যায়

না আমি শুধু শুধুই দুঃশ্চিন্তা করছিলাম । বাসটা এখন একেবারেই আমাদের সামনে । আমি বুঝে উঠার আগেই কে যেনো পিছন দিকে আমাকে জোড়ে বাসটিকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলো । কখন যে মনিব আমার সলতেতে আগুণ লাগিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিলো, বুঝতেই পারিনি । আমি আজ চরম ক্ষ্রিপ্ত, চরম উন্মাদ ! আমার সলতেতে দ্রোহের আগুণ লেগেছে !  কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরিত!  আমি অহংকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ক্ষণিকের মধ্যেই এক গগনবিদারী আর্তনাদের সৃষ্টি করি । আমি একা নই, আমার সাথে আরো অনেকগুলো পেট্রোল বোমা ঝাঁপিয়ে পড়লো শিকারের উপর, ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়াবতী হরিণের উপর । আমাদের ধ্বংসাত্মক নৃ-উল্লাসে চরমভাবে শিকার হলো যাত্রীসমেত সমস্ত বাস । বাসের ভিতরে-বাইরে নিমিষেই আগুণ ধরে গিয়েছে । আমি সর্বশেষ পড়লাম গিয়ে ঐ সিটটাতে যেখানে  স্বামী-স্ত্রী তাদের পাঁচ বছরের আদরের সন্তানটিকে নিয়ে দুটো সিটে পাশাপাশি বসে ঘুমোচ্ছিলো । বেচারা, দুজনই হয়তো ঘুমের ঘোরে বুঁদ হয়ে আছে । বাচ্চাটি কী ফুটফুটে সুন্দরই না দেখতে । ঐ মূহুর্তে আমার পাষাণ মনটাও চাইছিলোনা ওদের উপর গিয়ে পড়ি । কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে । ভাবতে ভাবতেই আমি ঠিক তাদের মাঝখানে পড়লাম । মুহুর্তেই টুকরো টুকরো মাংসগুলো এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো । আমার নাকে তখন দগ্ধ পোড়া মাংসের গন্ধ ছাড়া আর কিছুই আসছিলোনা । আমি চমকে গেলাম ! আচ্ছা, একটু আগেই না এখানে একটা ফুটফুটে শিশু অতি নিশ্চিন্তে তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আগামীর স্বপ্ন দেখছিলো আর তার পাশে তার মা  স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলো? ওরা কোথায়? আমি বাসের ভিতরে তাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে যা দেখলাম তার জন্য শুধু আমি কেনো, পৃথিবীর কেউই প্রস্তুত থাকবেনা । দশ-বারোজনকে চেনাই যাচ্ছে না, এর মানুষ নাকি অন্য কোনো প্রাণী ! অনেকক্ষণ পরে কে যেনো চিৎকার দিয়ে উঠলো, “ভাইয়া রে, আমাদের এ কি হয়ে গেলো রে !” এতোক্ষণ ধরে কেউ টু শব্দটুকুন পর্যন্ত করেনি । আসলে সবাই শ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিলো । অর্ধনগ্ন ঝলসে যাওয়া এক তরুণীর এই চিৎকারের পরপরই হঠাৎ করে অনেকগুলো গগনবিদারী আর্তনাদের সৃষ্টি হলো- আল্লাহ !  গভীর রাতে এ আর্তনাদ সাত আসমান ভেদ করে দ্বিগুণ-তিনগুণ প্রতিধ্বনিত হয়ে বার বার ফিরে আসছে । বেশিক্ষণ লাগলোনা, পাশ্ববর্তী গ্রামের শতশত মানুষ এসে জড়ো হয়েছে । গ্রামবাসীদের কেউ এই দগ্ধ,  মৃত-অর্ধমৃত মানুষগুলো কাছের বা দূরসম্পর্কের আত্মীয় নয় । তবু কেউ চোখের জল আটকিয়ে রাখতে পারেনি । শোকের মাতমে চারদিকটায় থমথম হয়ে গেলো । অথচ অ্যাম্বুলেন্সের হর্ণ, মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার, আফসোস, ধিক্কার সমানতালে চলছিলো । কে যেনো ডুকরে কেঁদে বললো, “আল্লাহয় জানে, কার বুক খালি করলো ! আহারে, এই মানুষটার দুই চোখই পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে । নাক-মুখ কিছুই  বুঝা যাচ্ছেনা । আর ঐ যে ঐ মহিলার হাড়-মাংস সব পুড়ে ঝলসে গেছে !” বাসের ওপাশে একজন মধ্যবয়সের লোক চিৎকার দিযে উঠেছে, “অ্যাম্বুলেন্স এদিকে নিয়ে আসো, এই লোকটা মনে হয় আর হাসপাতালে যেতে পারবেনা ! হায় আল্লাহ, মানুষগুলো এতো নিষ্ঠুর হয় কেমনে?” এতোক্ষণে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম- আমি আর সেই সলতে ভরা সুন্দর বোতলে নেই । বোতলের টুকরা যেখানে সেখানে পড়ে আছে । আমি আর আমাতে নেই, বাসের ভিতরে-বাইরে, যেখানে সেখানে লেপ্টে আছে পেট্রোল । আরো দেখলাম, যে মানুষগুলো পুড়ে ঝলসে গিয়েছে তাদের শরীর ভেদ করে আমি তাদের হাড় স্পর্শ করে ফেলেছি । ঝলসে যাওয়া মাংসে পেট্রোল আর পোড়ার গন্ধ সমানতালে ছড়িয়ে যাচ্ছিলো ।
পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া মা ও শিশু
পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া মা ও শিশু

ভোর হতে না হতেই একে একে বাসের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো নিকটস্থ হাসপাতালে । যেতে যেতে অনেকেই চলে গেলো ওপারে । আর যারা কোনো রকম বেঁচে ছিলো তাদেরকে নেয়া হলো বার্ণ ইউনিটে । অবস্থা খুব ভয়াবহ । শুধু আমি রইলাম বাসের সিটে, মানুষের মাংসে লেপ্টে। ঘটনাস্থলে আমার আয়ু শেষের দিকে চলে আসছে । আমি ক্রমশ ঝাপসা দেখছি । তবে মাথাটায় বেশ ঝিম ধরেছে ।  ঐ শিশুটা কি বেঁচে আছে? নাহ, কিছু ভাবতে পারছিনা । আমি বুঝতে পারছি আমি মৃত্যুর দিকে অগ্রসর মান । মৃত্যুর আগে পূর্বজনমের কথা মনে পড়ছে । ঐ যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটা বাসের দিকে লক্ষ্য করে আমাকে দুর্বৃত্তরা ছুঁড়ে মেরেছিলো । হ্যা, এইতো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেই বাসে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া যশোরের নুরুজ্জামান পপলু ও তাঁর মেয়ে মাইশা তাসনিমকে, তাসনিমের মা মিতা মাহফুজা কোনে রকম বাস থেকে লাফিয়ে বেঁচে গিয়েছিলো  । ঐতো দেখা যাচ্ছে কক্সবাজারের আবু তাহের, আবু ইউসুফকে, নরসিংদীর আসমা বেগম ও তাঁর ছেলে শান্তকে । ঢাকার ওয়াসিমের ঝলসে যাওয়া লাশটাও আজ খুব স্পষ্ট  দেখাচ্ছে।

বরিশালের সোহাগের অঙ্গার দেহটি দেখে আমি নিজেও চমকে যাচ্ছি । ট্রাকের হেলপার ছিলো । বেচারা পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিলো । মাগুরার রাস্তা ধরে যাওয়া একটা ট্রাকে আমার বিস্ফোরণে মৃত শ্রমজীবি রওশন বিশ্বাস, তাঁর ভাতিজা মতিন বিশ্বাস, শাকিল মোল্লা । মতিনের জীবনকাহিনীটা কি আপনাদের জানা আছে? মতিন ও তাঁর স্ত্রী রাহেদা বেগম বেশ সুখে শান্তিতেই দিন কাটাচ্ছিলেন । একসময় তাঁদের যমজ সন্তান হয় ।  অতি আদর করে নাম রাখেন- নিহা, নিশাদ  । দুজনের বয়স ৫ বছর । মতিন বিশ্বাসের মারা যাওয়ার ৯ মাস আগে আরেকটা সন্তান হয় । নাম নিরব । সোনার সাজানো  সংসারটুুকু একনিমিষেই ভেঙ্গে চুরমার ।  চাঁদপুরের ট্রাক মালিক খন্দকার শরীফ উদ্দিন যে কিনা দুর্বৃত্তদের ছুঁড়া পেট্রোল বোমায় নিজের ট্রাকেই পুড়ে মরেছে আজকে তাদের মুখচ্ছবি আমাকে তাড়া করছে ।
আচ্ছা আজকে আমি তাড়াতাড়ি মরছিনা কেনো? একের পর এক কষ্ট দিয়ে চলেছে । এর আগে পৃথিবীর অন্য দেশে আমি মৃত্যুর আগে এমনটি দেখিনি, আমার চোখে এমনটি ভাসেনি । আজ চোখে ভেসে চলেছে একের পর এক পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া মানুষগুলোর মুখ । কারণ এ পর্যন্ত পেট্রোল বোমায় যে ৭৪ জন মারা গিয়েছে তাদের সবাই সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষ । 
পেট্রোল বোমায় মৃতদের আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি আর অভিশাপ
পেট্রোল বোমায় মৃতদের আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি আর অভিশাপ
হে কাপুরুষের দল, হে অনাচারী, হে ভন্ড প্রতারক, ধর্মের ধ্বজাধারী, তুমি কি এখনো শুনোনি মাগুরার রকিব বিশ্বাসের অভিশপ্তবাণী, যাঁর ভাই রওশন আলী তোমার ছুঁড়া পেট্রোল বোমায় পরপারে চলে গিয়েছে? যারা তোমার দেয়া পেট্রোল বোমায় মারা গিয়েছে, পঙ্গু অবস্থায় অসহনীয় জীবনযাত্রা করছে তাঁদের আর তাঁদের আত্মীয় স্বজনের সবার মুখে আজ শুধু রকিবের মতো অভিশাপবাণী শোভা পায়, “আমরা তো ভাই রাজনীতি করি নে । তাইলে আমাগের ক্যান পুড়ে মরতি হবি? যারা রাজনীতি করে তাগের সাথে দ্বন্দ্ব না করে আমাগের মতো গরিবগেরে ক্যান পুড়ায়ে মারতিছে? আল্লা তাগের ওপর এহনো গজব দেয় না ক্যান?”

এই সেই রাস্তা, যেখানে আমাকে নিক্ষিপ্ত করে পালিয়েছিলো কাপুরুষ মনিব । যে আমাকে তার ভাষণে উত্তেজিত করে বলেছিলো, আমার বিস্ফোরণ নাকি বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্র ত্যাগ !  হায় রে কাপুরুষ, চন্ডাল, পাষন্ড, নির্দয়, অমানুষ ! যে একটা ফুটফুটে শিশুর শরীর ঝলসে দিয়ে মেরে ফেলতে এতোটুকুনও গ্লানিবোধ করেনা, একের পর এক সাজানো সংসারগুলো নষ্ট করতে যার হাত এতোটুকুনও কাঁপেনা, সে ক্ষমতায় গেলে মানুষের জন্য কী করবে তা আজ পরিষ্কার । আফসোস ! একটু আগে যদি আমি এটা বুঝতাম । বুঝেই বা কী করবো ! আমার যে প্রাণ নেই, আমি নিষ্প্রাণ পেট্রোল বোমা । আমাকে যে যেভাবে ব্যবহার করে সেভাবেই ব্যবহৃত হই । আমি তো নিজে থেকে পেট্রোল বোমা হইনি । আমার শরীর আজ থরথর করে কাঁপছে ভয়ে, না জানি মহান স্রষ্টা আমার প্রতি রাগান্বিত !

হে শান্তিকামী মানবজাতি, আমি পেট্রোল বোমার জীবন চাইনা । আমি ফিরে যেতে চাই আমার চিরায়ত, মানবতার কল্যাণমূলক কর্মকান্ডে । আমি পেট্রোল বোমা হয়ে বারবার জন্ম নিতে চাই না । আমাকে তোমরা সৃষ্টি করোনা । আমি যে পাপের ভার আর বইতে পারছিনা । আমি আজ ভীত অভিশাপ, ঘৃণায় ।

লেখক,
ইলিয়াস আহমেদ

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাঃ ভর্তিযুদ্ধ, র‌্যাগিং, বিশ্ববিদ্যালয় ও সার্টিফিকেট উপাখ্যান



মস্তিষ্কের নিউরনের সর্বোচ্চ ব্যবহারে, অজানা শঙ্কার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে, পৃথিবীর তাবৎ চিন্তার বোঝা একটা মাথায় নিয়ে, কেবলমাত্র পারিবারিক ও শুভাকাঙ্খীর স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে দিনরাত অমানুষের মতো পরিশ্রম করে, অসম-বন্ধুর-কণ্টকময় প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে নিজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আসন অর্জন করা কতটা যে কঠিন তা কেবল মাত্র ঐ ভুক্তভোগী ছাত্রটিই জানে ।

যখন সে কাঙ্খিত অর্জন করে ফেলে তখনই সে তার সমসাময়িক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম, অসীম শঙ্কা-ভয়-দুঃশ্চিন্তাকে অতীত ভাবতে শুরু করে এবং সব ঝেড়ে ফেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । নব উদ্যমে বাঁচতে শুরু করে, স্বপ্ন দেখে নতুন আগামীর । কিন্তু সে তো জানে না, সে কেবল প্রতিযোগিতার সিঁড়িতে পা রাখলো, তার জন্য উন্মোচিত হলো বিশাল প্রতিযোগিতার আসর! সে জানে না, কৃষকের স্বপ্নাতুর সন্তানকে নিয়ে এখন বিশ্ব তার মতো করে খেলবে, তার কাছে মজা লুটবে, প্রয়োজনে তার হাত-পা কেটে, রগ কেটে, চোখ উপড়ে নিয়ে ভৌতিক মঞ্চে তাকে ভূত সাজাবে! সেতো জানে না রাজনীতির ছেলেরা তার কাছে ফায়দা লুটবে, ক্ষমতাধরেরা তাদের ইচ্ছেমতো নাচাবে, । সেতো জানে না, ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়েরা একটা রুমে তাকে নিয়ে গিয়ে সারারাত হৈ হুল্লোর করবে, শার্ট-স্যন্ডোগেঞ্জি খোলার পর প্যান্ট খুলতেও বাধ্য করবে, শালীন-অশালীন বাক্যে মানসিক ও শারীরিকভাবে যতোটা পারা যায় জর্জরিত করবে, দেশে এমনো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে প্রয়োজনে যৌনচারে বাধ্য করবে । যখন সে এমন পরিস্থিতির শিকার হবে, সবই দেখবে এবং হায়েনাদের দ্বারা শিকার হবে, তখন কিছুই করার নেই । জোরপূর্বক সম্মানগ্রহীতা বড় ভাই শ্রেণিটি হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে কিংবা হোটেলে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করবে । এ যেনো সারারাতের পরিশ্রমের প্রাপ্যমূল্য! তখন ঐ ছাত্রটির কাছে যৌনপল্লীর পতিতাদের অবস্থান ভালো মনে হবে । কারণ, আর যাইহোক, অন্ততঃ পতিতারাতো ধর্ষনের শিকার হয় না । মানসিক ও শারীরিকভাবে কতটা নির্যাতিত হলে একটা ছাত্র নিজেকে ধর্ষিত ভাবতে পারে? সেই রাতটি ঐ ছাত্রটির জন্যে জীবনের অন্যতম কালো রাত । বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে, হল কিংবা মেসের দেয়াল ভেঙ্গে শব্দেতর বীণার সুর ছেদিত হয়ে অজানায় যাত্রা করে । কান্নায় ভেসে আসে আপনজনের মুখ । তারা যদি তাদের সন্তানের এই অবস্থা দেখে, তবে কি সইতে পারবে? আদরের ছোট বোনটি অথবা ভাইটি যদি তার ভার্সিটি পড়ুয়া ভাই অথবা বোনের এমুহুর্তের ধর্ষিত মুখটি দেখে, তাদের অবস্থা কী হবে? চোখের জলের একেকটা ফোঁটার সাথে হৃদয় থেকে নির্গমন হয় একেকটা স্বপ্ন, যে স্বপ্নগুলো বাঁধতে সময় নিয়েছে দীর্ঘ তেরো থেকে চৌদ্দটা বছর । মাত্র একটা রাতই তাকে এতোটা ভেঙ্গে দিয়েছে! শিক্ষাসিরিজের গল্পগুলো এখানেই শেষ হলেও বেঁচে যেতো আগামী প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ, কিন্তু চেইন অব সিস্টেমে আরো রয়েছে অনেকগুলো লেভেল । সেসব লেভেলে অন্তত ধর্ষিত হতে হয় না, তবে নিজেকে দিনে দিনে অপরাধী, অসহায়, পরিবারের উপর বোঝা ইত্যাদি মনে হয় । হয়তো সেই ধর্ষিত ছেলেটিও বছর যেতেই একরাতে কয়েকজন বন্ধুদের সাথে নিয়ে কোনো এক সদ্য চান্সপ্রাপ্ত ছাত্রকে বলবে, “বড় ভাইদের দেখলে সালাম দিস না কেনো? কান ধর! উঠবস কর! বুকডাউন দে! প্যান্ট খোল..!”

ভর্তিযুদ্ধ, র‌্যাগিং, বিশ্ববিদ্যালয়
সভ্যতার সভ্যতা- র‌্যাগিং
মনে আছে কি সেই ছাত্রটির কথা, যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পায় নি? তাদের কথা কি মনে আছে যারা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে নি? তারা অসমাপ্ত উপাখ্যানের চরিত্রে নিজেকে জড়িয়ে অনেকেই ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে, সবার কাছে তখন খ্যাতি ছেলেটিও ঠুনকো মনে হয় । এসময় নিন্দুকেরা বেশ সুযোগ পেয়ে যায় । পরিবার-পরিজন আর শুভাকাঙ্খীরা নিথর হয়ে এক ব্যর্থ সৈনিকের নির্বাক ঠোঁট আর অপলক-লাজুক চোখের দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকে । ব্যর্থ সৈনিক শুধু নিজেকে নিজের মাঝে গুটাতে থাকে । গুটাতে থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কেউ কেউ চিরনিদ্রা পর্যন্ত । তবুও কেউ কেউ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে । কিন্তু তাদের এ স্বপ্ন হোঁচট খায় কিছুদূর হেঁটে যাবার পর । প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যে ব্যতিক্রম ব্যতীত প্রায় সবারই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । অবশ্য এই বৈষম্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়েও রয়েছে । কে বলেছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধনী-গরীবের অন্ততপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো বৈষম্য নেই! স্কুল-মাদ্রাসা, প্রাইভেট-পাবলিক, বাংলা-ইংরেজি মিডিয়াম, ক্যাডেট-ক্যান্টনমেন্ট, গভঃ উচ্চবিদ্যালয়-উচ্চবিদ্যালয, প্রাইমারী-কিন্ডারগার্ডেন এসব কী? এখানেই কি থেমে গেছে! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, যেখান থেকে আগামীর নেতৃত্বের কর্ণধারেরা বের হবে, সেই স্বায়ত্ত্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পর সাপে-নেউলে অবস্থান, সুযোগ-সুবিধাসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে পরস্পর বিপরীতমুখী ও বৈষম্যমূলক । চাকরির ক্ষেত্রেও স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রভাব রয়েছে বটে । একই দেশের মাটিতে পড়ালেখা করে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার আমরা । গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষাব্যস্থায় এ কোন ধরণের গণতন্ত্রের ‍উদারতা, তা ভুক্তভোগীদের কাছে বড়ই রহস্যময়!

এতো গেলো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যের কিঞ্চিত কথা । আমরা একরকম ভুলেই গিয়েছি যে, একসময় এদেশের বড় বড় নাতুবাবু-ছাতুবাবুর ছেলেরা গুরুগৃহে কিংবা পাঠশালায় গিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে যেতো । আর মেয়েরা অন্দরমহলে । তখনকার জ্ঞানার্জন আজকের মতো আধুনিকায়ন না হওয়ায় তা সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ ছিলো না! তাই তখনকার শিক্ষাব্যবস্থায় যে যতো বড় জ্ঞানী ছিলো, তার অহংকার ততোই কম ছিলো, উদারতা ছিলো ততই বেশি । ‘শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হওয়া’ কথাটি তখনকার দিনের জন্য প্রযোজ্য । অথচ মূর্খতার কারণে আমরা তা আজকের দিনেও অপপ্রয়োগ করছি ।
এরা ছাত্র নাকি সন্ত্রাস? ছবিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোলা


বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে ছাত্র পরীক্ষার খাতায় ‘শ্রমের মর্যাদা’ রচনা লিখতে গিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কাগজ ফুরায়, সেই কিনা স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করার পর শিক্ষিত কৃষক হতে লজ্জা পায়, হকারি করতে লজ্জা পায়, কম মাইনের কাজ করতে লজ্জা পায়, ওয়ার্কশপের কালি তার কাছে তখন ঘৃণার বস্তু হয়, কলকারখানার ধোঁয়া তার কাছে মান হানিকরের বিষয়! অদ্ভূতের বিষয় নয় এটা । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এরচেয়ে বেশি শেখাতে পারেনি আমাদেরকে । বড় বড় ডিগ্রীর চাপায় তখন প্লেটো-এরিস্টটল, ইউক্লিড, পীথাগোরাসের শিক্ষা হারিয়ে যায় । সার্টিফিকেটের ঔদ্ধতায় হারিয়ে যায় ডঃ লুতফর রহমানের উন্নতজীবন, মহৎজীবনের শিক্ষা, তলিয়ে যায় সিস্টেমের অথৈ সাগরে । তাই দোষ কোনো ছাত্রের নেই, দোষ নেই কোনো শিক্ষকের । কারণ আজকের ছাত্রইতো আগামী দিনের শিক্ষক । এ শিক্ষাব্যবস্থায় থেকে যা হয়েছে তা হলো, কাগজে-কলমে এক রূপ আর বাস্তবিক ক্ষেত্রে তার বিপরীত রূপ ।
তাহলে এই পরস্পর বিরোধী ও প্রতারণাময় শিক্ষাব্যবস্থার কাছে আমরা কেনো সোনার ছেলেমেয়েদের আশা করি? সার্বিক চিন্তাসাপেক্ষে তাদের উপর কি এটা জুলুম নয়? আর যারা মনে করছেন প্রতিবছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সোনার ছেলেমেয়েরা বের হচ্ছে, তারা বিবেকের কষ্টিপাথর দিয়ে কি ঘঁষে দেখেছেন আসলে সোনার না সেমিগোল্ড? এখনো সময় আছে ভয়ংকর প্রতারণাময় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচানোর । নতুবা খুব বেশিদূর নয়, যেদিন চতুষ্পদ প্রাণীগুলোও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় জমাবে একটা ডিগ্রী নেয়ার জন্য, যেদিন বিশ্বখ্যাত এনকাউন্টার-টেরোরিস্ট তৈরি করার জন্য বিভিন্ন কোর্স চালু হবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেদিন কেবলমাত্র শিক্ষিত হওয়ার কারণে দেশে সৃষ্টি হবে আরেকটা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’!




লেখক-
ইলিয়াস আহমেদ

স্বপ্ন দ্যাখো, স্বপ্ন দ্যাখাও হে ভারতবর্ষ


সীমান্ত
এই বৃদ্ধ লোকটির নিক্ষিপ্ত ফলটি ওপারের মানুষটি পাবেতো?
মনে করুন, আপনার বস অফিসিয়ালি মিটিং-এ লুঙ্গি আর ফতোয়া পরে এসেছেন কিংবা জাতীয় সংসদে কোন মন্ত্রী সেকেলের পাদুকা পরিহিত এবং তার সাথে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরে এসেছেন । অথবা মনে করুন বিসিএস ভাইভা বা গুরুত্বপূর্ণ ভাইভাতে আপনি ক্লিন শ্যাভ না করেই এসেছেন ভাইভা দিতে । আজকের টাই-কোর্টের যুগে ভদ্রসমাজের কাছে কী হাস্যকরই না হবে ব্যাপারটা ! সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোনো ছাত্র ক্লিন শ্যাভ না করে খোঁচা খোঁচা দাড়িঁ নিয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে যায়, বেশিরভাগ শিক্ষক মহোদয় তার মৌখিক পরীক্ষাই নেন না, কোথাও এমনটিও হয়েছে যে, পরীক্ষাতো নেয়ইনি, তার উপর অপমান করে তবেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে । আর ফরমাল ড্রেস না পড়লে মৌখিক পরীক্ষা দেয়া তো দূরের কথা, স্যারের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবেনা ।

ফরমাল বা অফিসিয়াল ড্রেস বলতে আমরা আজকে যা জানি কয়েক শতাব্দী আগে এদেশের মানুষতো জানতোইনা, সমগ্র ভারতবর্ষ তার নামও শুনেনি । ব্রিটিশরা যেদিন থেকে ভারতবর্ষকে শাসন করতে শুরু করলো, তারা এ উপমহাদেশের মানুষকে বুঝাতে সক্ষম হলো যে তারাই পৃথিবীর একমাত্র উন্নত জাতি! সেটা উচ্চ করারোপের মাধ্যমেই হোক, জোরপূর্বক নীলচাষে কৃষকদের বাধ্য করেই হোক, জমিদার প্রথা সৃষ্টি করেই হোক, ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভাজন করেই হোক, তাদের দেয়া শিক্ষানীতি চাপিয়ে দিয়েই হোক, ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেই হোক আর এ উপমহাদেশের কাঁচামাল ও ধনসম্পদ ইউরোপ মহাদেশে পাচার করেই হোক অর্থ্যাৎ যতো অন্যায় করেই হোক ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, তারাই একমাত্র উন্নত জাতিই শুধু নয়, একমাত্র পরাশক্তিধর জাতি । তারা বাদে আর যতো জাতি আছে কেউ জঙ্গী জাতি, কেউ বর্বর জাতি, কেউ অনগ্রসর জাতি, কেউ হামুখো বাঙ্গালী জাতি !

ভারতবর্ষে শাসনের সুবিধার্থে ব্রিটিশরা এদেশের সেই সব শিক্ষিত শ্রেণীটিকে গ্রহণ করলো যারা ইতোমধ্যে ব্রিটিশদেরই চাপিয়ে দেয়া আত্মাহীন সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়েছে । সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ব্রিটিশরা আরো একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করলো, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা । কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা (আজকে যেটি আলীয়া বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করে তাদের মনগড়া সিলেবাস ও ইসলাম শিখিয়ে ব্রিটিশরা আরেক শিক্ষিত শ্রেণীর জন্ম দিলো, যারা শিক্ষাদীক্ষায় সাধারণ শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত । এবং এ শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রাখাই হলোনা যাতে করে, এ শিক্ষিত শ্রেণীটি অন্যান্যদের মতো রোজগার করে খেতে না পারে । যে ইসলাম শেখানো হলো তা ফতোয়াবাজী, কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যায় পরিপূর্ণ, যা কেবল মতানৈক্যের সৃষ্টি করে, ঐক্যবদ্ধজাতিতে অনৈক্য সৃষ্টি করে । একদিকে কেরানীমার্কাধারী শিক্ষিত শ্রেণী যাদেরকে শেখানো হলোনা ধর্মীয় নীতিবোধ, যাদের মাঝে না আছে ধর্মীয় জ্ঞান আর অপরদিকে কথিক আলেম শ্রেণীটি, যাদের মাঝে আছে কেবলমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান । স্বভাবতই প্রথম শ্রেণীটি ব্রিটিশ পা চাটা গোলামের পারদর্শীতা অর্জন করলো আর দ্বিতীয় শ্রেণীটি ঝুকেঁ পড়লো ধর্মব্যবসার মধ্যে । বিকৃত ইসলাম শিক্ষিত শ্রেণীটি আর সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণীটির পরস্পর বিরোধী অবস্থান নেয়ার কারণে এই প্রথম জন্ম নিতে শুরু করলো জাতির মধ্যে অনৈক্য ।
প্রথম দিকে হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন সরকারি অফিস আদালতে চাকুরীর সুযোগ পায় আর ব্রিটিশদের মনোবাসনাই ছিলো একসময়ের পাল,মৌর্য,গুপ্ত,শাহ, মুঘল, প্রভৃত রাজ-রাজাদের উত্তরসূরীদেরকে কেরাণি বানিয়ে ইচ্ছামতো পায়ের নিচে পিষবে । তাদের এই মনোবাসনা পূরণও হয়েছিলো । দাউদ কররাণীর পরবর্তী সকল নবাব রাজাদের ক্ষেত্রে এই হয়েছিলো যে, কেউ নামে মাত্র নবাব বা রাজা, কেউ মদতপুষ্ট । সর্বশেষ নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশরা তাদের সিদ্ধ লাভ করে ।

জমিদারি প্রথার শেষের দিকে এ উপমহাদেশের অফিস আদালতে স্বদেশীরা চাকুরীর সুযোগ পায় । ব্রিটিশদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরে পরিণত হয়ে ভাবেন, এ উপমহাদেশের ছেলেমেয়েরা এতো অলস কেনো? তাদের সিলেবাসে আরো বই চাপিয়ে দেয়া উচিৎ, পিছিয়ে পড়ছে প্রজন্ম! কিন্তু সেদিনের বিদ্যাসাগর কি এতোটুকুনো ভাবলেন না যে, সবাই তার মতো বিদ্যাসাগর না, সবার শিক্ষা ধারণ ক্ষমতাও এক না? সেদিনের বিদ্যাসাগরের মনে এ প্রশ্নের উদয় না হলেও তাঁর মতো না হোক, কাছাকাছি বর্তমান প্রজন্মের বিদ্যাসাগর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারেরা শেষ পর্যন্ত ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছেন, আর যাই হোক, এভাবে বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে গেলে উত্তরোত্তর প্রজন্ম বইয়ের ভার বইতে না পেরে নুইয়ে পড়বে; ভেঙ্গে যাবে জাতির মেরুদন্ড ।

ঈশ্বরচন্দ্রের ন্যায় নওয়াব আব্দুল লতিফ, স্যার সৈয়দ আমীর আলীও যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কী করে মুখ থুবড়ে পড়া জাতিটিকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে একটা কেরানীপেশার চাকুরী হাতে ধরিয়ে দিয়ে উন্নত করা যায়, যদিও মুখ থুবড়ে পড়ার পিছনে কেবলমাত্র ইংরেজদের কুশাসনই দায়ী! আসলেই কি তাদের এই প্রচেষ্টা ভারতবর্ষের জাতিটিকে উন্নত করতে পেরেছিলো? দাস জাতিটিকে মুক্ত না করে ইংরেজদের আদালে গড়তেই স্বপ্ন দেখতো তৎকালীন ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবীরা । অবশ্য এটাই স্বাভাবিক ছিলো । কারণ তারাতো সবাই ইংরেজদের শিক্ষানীতিতে শিক্ষিত!
আজকের ভারতবর্ষ একসময় ছিলো ধনসম্পদে ভরপুর, অভাবহীন শান্তিময়, সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যপূর্ণ জাতির মেলবন্ধন । ভারতবর্ষের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো ঐশ্বর্য্য, সংস্কৃতির লীলারূপ । সেই লীলারূপে মোহিত হয়ে এখানেই স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেছিলো আরব-পারস্যের মুসলিম জাতিটি । তারা এখানে এসে এ উপমহাদেশের সংস্কৃতি রক্তে মেখেছিলো । কিছুদিন আগেও মুসলিমদের নামের আগে শ্রী যুক্ত করতে তাদের কুন্ঠাবোধ জাগেনি । এ উপমহাদেশে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমরা হিজাব খুলে শাড়ি পরেছে, জোব্বা-পাঞ্জাবী খুলে লুঙ্গি-ধুতি-ফতুয়া পরেছে । এদেশেরই নারী-পুরুষদের করেছে জীবনসঙ্গিনী, এদেশে থেকেই তারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে । আরব্যরজনীর উপন্যাসের চেয়ে তাদের ছেলে মেয়ের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে ঠাকুমার ঝুলির মতো এ উপমহাদেশের মজার মজার গল্পগুলো । ভারতবর্ষেতো আরো অনেক জাতিই এসেছিলো বাণিজ্য করতে । বাণিজ্য করতে এসে তারা কী করেছে তা ইতিহাসে লেখা থাকলেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আজ ব্রিটিশরাই সমাদৃত ! অথচ ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশে এসে লুটপাট-স্বৈরাচারী শাসন-চাবুক পেটানো ছাড়াও অতিরিক্ত যা করেছে তা হলো, তারা এ উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে তো মেনেই নেয়নি তার উপর ইউরোপের সংস্কৃতি ভারতবর্ষের বাঙ্গালীসহ অন্যান্য জাতিগুলোর উপর চাপিয়ে দিয়েছিলো সুকৌশলে । সুকৌশলে বলার কারণ এজন্যই যে, তখন ইংরেজি ভাষা শেখা, ধুতি-পাঞ্জাবী ছেড়ে বিলেতি পোষাক (আজকের ফরমাল ড্রেস) ছাড়া সরকারী চাকুরী জুটতোনা । এভাবেই তারা তাদের সংস্কৃতির কৃত্রিম প্রয়োজনীয়তার সৃষ্টি করে, পরবর্তীতে যেটা কাস্টম হয়ে দাঁড়ায়, যা আজ এতোটাই বেসম্ভব জনপ্রিয় পেয়েছে যে, অফিস-আদালত-হাসপাতাল-বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এর বিপরীতে ধুতি-লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পড়লে নিজেকে সাংস্কৃতিক জোকার মনে হয়, ইংরেজিতে আমরা যাকে বলি ‘Uncultured’ . একসময়ে যে পোষাক প’রে রাজ্য পরিচালনা করতো সেই জাতি কিনা পরগাছা হয়ে একদিকে অন্যজাতিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করছে আর অন্যদিকে নিজেকে হীনজাতি, নীচ, অনগ্রসর, অলস ইত্যাদি বলে গালি দিচ্ছে । ভারতবর্ষের কি নির্মম ইতিহাস ! তাই শুরুর দিকে এ প্রসঙ্গটাই টেনে এনেছিলাম ।
ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশের সম্পদের লোভে বাণিজ্য করতে এসেছিলো, আরবজাতিটির মতো স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য নয় । সমগ্র ভারতবর্ষে হাতে গোনা কয়েকজন ইউরোপিয়ানের কবর পাওয়া যেতে পারে যারা ব্রিটিশ শাসনকরাকালীন এখানে মৃত্যুবরণ করেছিলো । অপরপক্ষে এ উপমহাদেশে আগত আরবজাতিটির ইতিহাস তার তুলনায় কতগুণ বেশি ! কয়জন ব্রিটিশ এ উপমহাদেশের নারী কিংবা পুরুষকে বিয়ে করেছে, জীবনসঙ্গী করেছে? বিয়ে করার প্রশ্নই আসেনা । যাদেরকে চাবুকের প্রহারে শিশু থেকে বৃদ্ধতে পরিণত করেছে, যাদেরকে পায়ের তলে রেখেছে তাদেরকে হঠাৎ করে বুকে টেনে নেয়া নিতান্তই বোকামি । নীলকুঠিগুলো যেনো আজও সাক্ষী দেয়, এখানে কয়েকবছর ধরে হাজারও ভুখা কৃষককে ‘লাগান’ বা ‘খাজনা’র জন্য বন্দি রাখা হয়েছিলো, চাবুক দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিলো, তাদের স্ত্রী-কন্যার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে সেই খাজনা আদায় করা হয়েছিলো !
ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশের কৃষকদের রক্ত দিয়ে ইউরোপে গড়ে তুলেছিলো বড় বড় শিল্পকারখানাগুলো । তাদেরই ভ্রান্তনীতির কারণে এ উপমহাদেশে একাধিক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো । ১৮৭৬ সাল থেকে শুরু ১৮৭৮সাল পর্যন্ত দুইবছরব্যাপী দুর্ভিক্ষে এ উপমহাদেশে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬১,০০০,০০ থেকে ১০৩,০০০,০০ জন (রিপোর্টঃ Late Victorian Holocausts. 1. Verso, 2000. ISBN 1-85984-739-0 pg 7, Written by Davis, Mike.) আর তার মাত্র ২১ বছরের মাথায় অর্থ্যাৎ ১৮৯৯ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে আবারো দুর্ভিক্ষে পড়ে ভারতবর্ষ । এটাকে ভারতীয় মন্বন্তর বলা হয় । এই দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৫,০০০,০০ থেকে ১০০,০০ জন । (রিপোর্টঃ Reintegrating India with the World Economy, Peterson Institute for International Economics, Wikipedia).
ব্রিটিশরা শুধু এটুকুন করেই ক্ষান্ত হয়নি । তারা এ উপমহাদেশে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি করে । ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নির্দেশে সর্বপ্রথম ১৯০৫ সালের ১৬ ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ অর্থ্যাৎ বাংলা বিভাজন হয় । বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে ১৯০৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক হৃদয়স্পর্শী সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” রচনা করেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয় । ১৯১১ সালের প্রচন্ড গণআন্দোলনের তোপের মুখে পড়ে বঙ্গভঙ্গ রহিত করতে বাধ্য হয় ভাইসরয় । যেহেতু ব্রিটিশদের শাসন করার নীতিই ছিলো ‘বিভক্তি ও শাসন’ (Divide & Rule) নীতি, স্বভাবতই ১৯৪৭ সালে তারা বাংলা প্রদেশকে চূড়ান্ত বিভক্তি করলো । ভারত ও পাকিস্তানের বিভক্তি রেখার নামই রাখলো ‘র‌্যাডক্লিফ লাইন’ । এই ‘র‌্যাডক্লিফ লাইন’ কি ঘিরে ভারতবর্ষে কতইনা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়েছে । রেডক্লিফ লাইনেরর এ পারের মানুষ ওপারের মানুষকে ঘৃণা করতে শুরু করলো, ওপারের মানুষ এ পারের মানুষকে । কাঁটাতারবিহীন একসময়ের ভারতবর্ষ আজকের দিনে যে যার মতো সীমান্তে গুলি করে মারছে তারই একসময়ের প্রাণের ভাইবোনকে । ধর্মের ভিত্তিতের ভারত বিভাজনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জলজ্যান্ত প্রমাণ আজকের জম্মু-কাশ্মীর, যার কোনো সুরাহাই মিলছেনা, লাশের পর লাশের বন্যায় ভিজেছে এ দুটো অঞ্চল ।
বারবার চাপের মুখেও পড়ে ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত যেকারণে ‘বিভাজন ও শাসন’ (Divide & Rule)নীতিতে বিশ্বাসী ছিলো, তা হলো, ইতোমধ্যেই তারা দেখেছিলো এ উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অভাবনীয় । আর এই ব্রিটিশবিরোধী ঐক্যেবদ্ধ আন্দোলনের কাছে তাদের কামান-গোলা-চাবুকের গুরুত্বই নেই । ফকির-সন্নাসী-ফরায়েজী আন্দোলনে তাদের বুক কেঁপে উঠেছিলো । ভারতবর্ষকে দ্বিখন্ডিত করতে গেলে ব্রিটিশরা বারবার চাপের মুখে পড়ে । এ উপমহাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক বিভাজন চায়নি । চায়নি রবীন্দ্রনাথ, চায়নি নজরুল । নজরূল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লিখেছিলো যুগবাণী, বিষের বাঁশী, ভাঙ্গার গান, প্রলয় শিখা, চন্দ্রবিন্দুর মতো গ্রন্থ যা যথাক্রমে ১৯২২,১৯২৪,১৯২৪,১৯৩১,১৯৩১ সালে বাজেয়াপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার । অগ্নিবীণা, সর্বহারা, রুদ্রমঙ্গল সহ আরো অনেক বই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে এবং বাজেয়াপ্ত বইগুলোসহ এই বইগুলো কারো কাছে রাখা গুরুতর অপরাধ ছিলো । তৎকালীন পুলিশ কর্তা স্যার চার্লস টেগার্ট এবং ব্রিটিশদের তৈরী করা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত তৎকালীন পাবলিক প্রসিকিউটর রায়বাহাদুর তারকানাথ সাধু সর্বহারা’ বইটি নজরুলের ‘নিষিদ্ধ করার পে মতামত দেন, যদিও তাদের সুপারিশে ইংরেজ সরকার বইটি শেষ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করেন নি । প্রসিকিউটর রায়বাহাদুর তারকানাথ সাধুদের মতো দেশীয় প্রায় বেশিরভাগের অন্তরাত্মায় অসাধু, ব্রিটিশদের চাটুকারিতা, দাসত্ব বেশ ভালো করেই ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয় ব্রিটিশ শিক্ষানীতি ।

বঙ্গভঙ্গের পূর্বে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা প্রদেশেরই অন্তর্ভূক্ত ছিলো, বঙ্গভঙ্গের কারণে যা পরবর্তীতে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয় । উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গটি ছিলো ধর্মের ভিত্তিতে । পশ্চিমবঙ্গ হিন্দু প্রধান হওয়ার কারণে তাকে হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র ভারতে সংযুক্ত এবং বাংলা প্রদেশে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করা হয় । প্রাদৈশিক শাসনের সুবিধার্থে পাকিস্তানকে আবারো দুই ভাগে ভাগ করা হয়, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান । পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব থেকেই ব্রিটিশদের একচোখা নীতির কারণে পাকিস্তানে একচ্ছত্র রাজ্য বিস্তার করে এবং বঙ্গভঙ্গের ফলে নব্য সংযুক্ত বাংলা প্রদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান অনেক পিছিয়ে পড়ে । ব্রিটিশদের শেখানো শিক্ষাব্যবস্থায় ইতোমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে দুই শ্রেণীর মানুষের প্রভাব বাংলা প্রদেশের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যায় । একশ্রেণী পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োজিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অন্যদিকে ব্রিটিশদের শেখানো বিকৃত ইসলামের আলেমরা ফতোয়াতে বাংলা প্রদেশকে হিন্দুর দেশ ও বাংলাভাষাকে হিন্দুর ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করে । পরবর্তীতে আলেমদের ফতোয়াতে ও ব্রিটিশদের শেখানো স্বৈরাচার শাসনব্যবস্থায় জোরপূর্বক এদেশের রাষ্ট্রভাষাকে বাংলার পরিবর্তে উর্দু করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হয় । জন্ম নেয় বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন । উল্লেখ্য, ব্রিটিশদের শেখানো বিকৃত ইসলামে শিক্ষিত পশ্চিম পাকিস্তানের আলেম শ্রেণীটির সাথে বাংলা প্রদেশের আলেমের যথেষ্ট সহমত ছিলো যা একাত্তরে তাদের মাধ্যমে ইসলামকে পুজিঁ করে ‘আলবদর’, ‘আলশামস’ ‘শা্ন্তিকমিটি’ ইত্যাদি গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার মাধ্যমে প্রকাশ পায় । এদেশে ধর্ম নিয়ে যারা আজও অপরাজনীতি করে যাচ্ছে তাদের এক শ্রেণী এবং অতি উৎসাহী নাস্তিকদের এক শ্রেণী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ‘ধর্মীয় যুদ্ধ’ বলে অপপ্রচার করে যাচ্ছে । তাদের এই অপপ্রচারই প্রমান করছে তারা স্বার্থপক্ষ হাসিল করার জন্যই এসব করছে । কারণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যদি ইসলামের বিরুদ্ধে হতো, তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘ইনশাআল্লাহ’ শব্দটা ভুলক্রমেই উচ্চারণ করতেন না । মুক্তিযুদ্ধ করতে যারা মরে গিয়েছিলো তাঁদের নামের আগে ‘শহীদ’ শব্দটা কখনই যোগ হতোনা, রূহের মাগফেরাতও কামনা করা হতোনা । আর যে মুক্তিযোদ্ধারা আজও বেঁচে আছেন তাঁরা সবাই ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করতেন । লাহোরে বঙ্গবন্ধু ছয়দফার যে প্রস্তাবনামা উত্থাপন করে সেখানে বাংলা প্রদেশে স্বাধীন প্রাদৈশিক নির্বাচন, অর্থ্যনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, সামাজিক বিভিন্ন বৈষম্যের বিপরীতে ধর্মের কথা লিখা থাকতো । ঐ দুই শ্রেণীর কাছে প্রশ্ন হলো- এসবের কোনটা এ পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত হয়েছে বা কোনটা সত্য ছিলো? তবু এই দুটো শ্রেণী স্বাধীনতার পরও বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছে জাতিকে চরম বহুখন্ডে বিভক্ত করার জন্য । তাদের এই চেষ্টার ফলই হলো শাহবাগ ও শাপলা চত্ত্বর আন্দোলনের ইতিবৃত্ত ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশরা যখন আর ভারতবর্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলোনা, যখন দেখলো ভারতবর্ষকে আর শোষণ করার মতো বাকি কিছুই অবশিষ্ট ছিলোনা, তখন তারা ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিলো, তার সাথে আরো একটা বর দিলো, সেটা হলো গনতন্ত্র । যদিও নিজেরা ভারতবর্ষকে দীর্ঘদিন ধরে শাসনের সময় একটি মুহুর্তের্ জন্যও গণতন্ত্রকে স্মরণ করেনি, চাবুক আর বুটের লাথিই ছিলো তাদের শাসন নীতি । ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছে আর রেখে গেছে তাদের রোপিত অনৈক্যের শিক্ষানীতি, গণতন্ত্র, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারনীতি, ধর্মীয়-রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক মূলক রাজনীতি, যার প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রগুলো । একাত্তরের বিজয়ের মাধ্যমে আমরা শুধু এতোটুকুন অর্জন করেছি যে, বিশ্বের মানচিত্রে একটা স্থায়ী জায়গা, লাল-সবুজের পতাকা, পশ্চিম পাকিস্তানের সকল বৈষম্য-শোষণ থেকে মুক্তি আর একটা দীর্ঘশ্বাস । বিনিময় আমাদের অনেক রক্ত দিতে হয়েছে, দিতে হয়েছে লক্ষকোটি প্রাণ । আজকের বাংলাদেশ একাত্তরেও দেখিয়েছিলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ । যার কারণেই বিজয় লাভ করা সম্ভব হয়েছিলো । স্বাধীনতা লাভ করা সত্ত্বেও আজ ৪৩ বছর পরেও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এ জাতি । কারণ ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত নীতি থেকে আমরা আজ এতোটুকুনও বিচলিত হতে পারিনি । তাদের দেয়া শিক্ষানীতি থেকে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণীয় প্রসিকিউটর রায়বাহাদুর তারকানাথ সাধু । আদর্শ বলতে আমরা বুঝি পাশ্চাত্য, উন্নত বলতেই আমরা বুঝি পাশ্চাত্য, হোক সেটা শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার যেকোন একদিক । ভারতবর্ষের মানুষ আজ প্রাচ্যকে দেখে অনগ্রসর, গেঁয়ো এক সভ্যতা হিসেবে । তাই নিজেকে উন্নত করতে এদেশের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মত্তোর বিলেতে পাড়ি জমায়, সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করে, আর নিজের পিতৃপুরুষদের ভারতবর্ষকে গালি দেয় । অথচ এ ভারতবর্ষই একদিন ছিলো বাণিজ্য করার যোগ্যতম জায়গা । এখানেই জন্মেছিলো রাম, কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির, সিদ্ধার্থের মতো মহামানব । এখানেই জন্মেছিলো ভাস্কারাচার্য, রামানুজানের মতো বিখ্যাত গণিতবিদ । এখানেই জন্মেছিলো চীন বিখ্যাত গুরু, ভেষজ চিকিৎসক, চীনের মার্শাল আর্টস শাওলিন মন্দিরের প্রতিষ্ঠিাতা বোধিধম্মণ । এই ভারতবর্ষ ছিলো ভেষজ, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাসহ সমস্তরকম জ্ঞানভান্ডারের আধার । আর আজকের দিন আমাদের সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্যকে ঘিরে । দলাদলি-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একদিকে নিজেই নিজেরা মরছি, আর অন্যদিকে ভুলে যাচ্ছি আমাদের অতীত ইতিহাস । পাশ্চাত্য অন্ধমুখীতা থেকে আজও আমরা বের হতে পারছিনা, অথচ পাশ্চাত্যনীতিই ভারতবর্ষকে পরিণত করেছে অনগ্রসর, পশ্চাতগামীতায় । এখানে এখন প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুন-হত্যা-গুম, ধর্ষণ-রাহাজানি-ছিনতাই, সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ-ধর্মীয় অপরাজনীতি ইত্যাদি । একটা জিনিস কখনই ভুলে গেলে চলবেনা, জাতির উন্নতির পরিমাপ যান্ত্রিক প্রগতি নয়, শান্তি ।
আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই শান্তি চাই, আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে অসাম্প্রদায়িক, অখন্ডনীয়, স্বকীয়নীতির ভারতবর্ষে । যেখানে থাকবেনা কোনো কাঁটাতার, র‌্যাডক্লিফ লাইন, সীমান্তচুক্তি, নদীবাধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা । আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের হারানো নীতিবোধের দিকে যেখানে শাস্ত্রের শাসনে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো রামরাজত্ব । ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আমরা যদি জাত-পাত–অনৈক্যের ঊর্ধ্বে প্রাণে প্রাণ মিলাতে পারি, কাধেঁ কাঁধ রেখে মানবতার কাজ করতে পারি, ভারতবর্ষে আবারো নেমে আসবে স্বর্গীয় সুধা, বারিবর্ষণে মুখরিত হবে গুজরাট, তেলেগু, মুম্বাই, কাশ্মীর, বেলুচিস্তান, করাচী, ঢাকা, কোলকাতাসহ সমগ্র ভারতবর্ষ । ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেয়া সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রথম শর্তই হলো সমগ্র ভারতবর্ষকে এক স্রষ্টারনীতিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো একাত্তরে । শুধু এতোটুকুন সদিচ্ছার উপর নির্ভর করছে সুখী-সমৃদ্ধ-সম্প্রীতিতে পরিপূর্ণ আগামীর ভারতবর্ষ, যে স্বপ্নের জাল বুনে গেছেন অনেক জ্ঞানীগুণীজনেরা । তার মধ্যে শাহ আব্দুল করীমের গানে সরাসরি ফুটে উঠেছে-

“আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম !
গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু-মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম !
হিন্দু বাড়িতে যাত্রা গান হইতো,
নিমন্ত্রন দিতো, আমরা যাইতাম !
জারিগান বাউলগান আনন্দের তুফান,
গাইয়া সারিগান নৌকা দৌড়াইতাম !
বর্ষা যখন হইতো, গাজির গান আইতো,
রঙ্গে ঢঙ্গে গাইতো আনন্দ পাইতাম !

কে হবে মেম্বার কে বা সরকার,
আমরা কী তার খবরও লইতাম?
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম !
করি যে ভাবনা, সেইদিন আর পাবোনা?
ছিলো বাসনা সুখী হইতাম !
দিন হতে দিন, আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোনপথে যাইতাম
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম !”

এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রত্যেককে । সিদ্ধান্ত নিতে হবে এটার উপর যে, আপনি নিজেকে ব্রিটিশদের পা চাটা গোলাম জগৎশেঠ-মীরজাফর-প্রসিকিউটর রায়বাহাদুর তারকানাথ হিসেবে দেখাতে চান? নাকি ব্রিটিশবিরোধী নজরূল-রবীন্দ্রনাথ-ক্ষুদিরাম হিসেবে? অফিস-আদালত পাড়ায় লুঙ্গি-ধুতি-পাঞ্জাবী পরে বিলেতী বাবু সাজতে আপনার বিবেকে বাঁধেনা, বিবেকে বাঁধে তখন, যখন ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেয়া জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে ভারতবর্ষের চিরায়ত জীবনব্যবস্থার কথা বলা হয় । বিবেকে বাঁধে তখন, যখন অনৈক্যের পরিবর্তে ঐক্য, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্প্রীতির কথা বলা হয় । বিবেকে বাঁধে তখন, যখন ব্রিটিশদের শিক্ষায় শিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ী আলেম, পাশ্চাত্যের অন্ধঅনুকরণ আর গ্রহণযোগ্যতায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী আর মিডিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলা হয় । জানিনা, এতোকিছু বলার পরও কি কিছু মিলবে ! সবার দৃষ্টিভঙ্গি কোনদিকে যাবে, সেটা যদি তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে পরিণত হয় তাহলে আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের কথায় কী আসে যায় ! শাহ আব্দুল করীমের মতো শান্তিপ্রিয় লোকদের আফসোসে ভরা একটাই গান বারবার গাইতে হবে,
“আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…!”

আমি মানুষ হইবো কেনো?


শৈশব হইতে আজ অবধি মোর শিক্ষাগ্রহণের পেছনেই পিতার খরচ হইয়াছে কাড়ি কাড়ি টাকা। প্রাথমিক বিদ্যালয় হইতে বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও আমাকে অর্থ ব্যতীত পরীক্ষার হলে ঢুকিতে দেয় নাই। পাস করিবার মতো জ্ঞান অর্জন হইলেও কেবল টাকার জন্য উপর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হইতে পারি নাই। জ্ঞান প্রদান করিবার পূর্বে সকলেই আমার দরিদ্র পিতার অর্থ-কষ্ট আরও বাড়াইয়া দিয়াছে। চাকুরী পাইবার আগ পর্যন্ত আমার পড়ালেখার জন্য এক পর্বতসম অর্থ ব্যয় করিতে হইয়াছে। তার উপর এর দ্বিগুণ-তিনগুণ শুভেচ্ছামূল্য (কে যেনো বলিয়াছিল ইহার নাম ঘুষ, উৎ কোচ) প্রদান করিয়াই চাকুরীর এই আসন অলংকৃত করিয়াছি। আমাকে তো শিক্ষার পিছনে এত (ঠিক কতো টাকা তার হিসাব নাই) টাকা ব্যয় করিতে হইয়াছে। সেই আমি কেন দুর্নীতি করিব না? না খাইয়া মরিব নাকি? বিনা টাকায় মানবসেবা করিতে গেলে কি আর পেটে ভাত পড়িবে? লক্ষ-কোটি টাকা ব্যয় করিয়াছি ডাক্তার হইবার জন্য। মেডিকেল কলেজে টাকার ব্যাপারে কেহ এতটুকুনও ছাড় দেয় নাই। পিতার জমি বিক্রি করিয়াছি। দামি দামি বই, প্র্যাক্টিকাল সেট, বোন সেট, ল্যাপটপ আর কয়েক মাস পর পর অ্যাপ্রন ক্রয় করিবার জন্য কত যে অর্থব্যয়
করিতে হইয়াছে তাহার কোনো হিসাব মিলিবে না। এতসব কাঠখড় পোড়াইয়া তবেই না আমি বড় ডিগ্রিধারী চিকিৎসক হইয়াছি। পিতা আর শুভাকাঙ্খী আত্মীয়- স্বজনেরা স্বচক্ষে দেখিয়া আসিতেছে ‘চিকিৎসা সেবা’
ব্যবসাটি বর্তমান সময়ে বিশেষ লাভজনক আবার সম্মান জনকও বটে। সেই দিকটা বিবেচনা করিয়াই আমার পেছনে দু’হাত ভরে খরচ করিয়া তাঁহারা আজ একেবারে নিঃস্ব হইয়া আসিয়াছে। আমি ইবনে সিনা নই, হাজী মোহাম্মদ মহসীনও নই। আগে পিতার টাকার ঝুলিটা পূরণ করিতে হইবে অতঃপর নিজেরটা। তারপরেই না হয় ভাবিব কী করিয়া বিনামূল্যে চিকিৎসায় মানবসেবা করা যায়! সেই জন্যইতো সরকারি হাসপাতালের
চাইতে ক্লিনিকের, বিনা পয়সার রোগীদের চাইতে পার্সোনাল চেম্বারের রোগীদের কদর বেশি। ইহা না করিতে পারিলে কী আর এতদিনের আশা আকাক্সক্ষা পূরণ করিতে পারিব? জমি বিক্রি করিয়াছি, ব্যাংক থেকে চড়াসুদে ঋণ লইয়াছি, অতঃপর নির্বাচনের প্রচারণা চালাইয়াছি। পাড়ায়-মহল্লায় নিজের পদপ্রার্থিতা উপলক্ষ্যে মিছিল-মিটিং-এর ব্যবস্থা করিয়াছি। নির্বাচনে জয় পাবার নিমিত্ত আমি কোটি কোটি টাকা ক্ষয় করিয়াছি।
তা না হলে কেহ যে আমাকে ভোট দিয়া জয়যুক্ত করিবে না, তা আমি যতই সৎ হই না কেন। দিনের পর দিন ভাষণে বলিয়াছি, ‘সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা, আমাকে জয়যুক্ত করিলে আপনাদের সেবা করিয়া কৃতার্থ হইব’ আর রাতের আঁধারে বড় বড় নোট দেখাইয়া ভোট কিনিয়াছি। নূতন পাঁচশ’ টাকার নোট দেখিয়া তোমাদিগরও জিহ্বা লোভে লক লক করিয়া ছিল। আমাকে বোকা পাইয়াছ? দুর্নীতি করিয়া লাভসহ মূলধন উঠাইব না- তো কী করিব? ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেইদিন হইতে যাতায়াত শুরু করিয়াছিলাম, সেইদিনই ধর্মীয় ওস্তাদ (!) আমাকে শিখাইয়াছেন কী করিয়া ধর্মের বাণী শুনাইয়া লোকের নিকট হইতে টাকা খসাইতে হয়। তিনি আমাকে ইহা শিখান নাই ধর্মের বিনিময়ে অর্থগ্রহণ করিলে ইহা আর ধর্মীয় কাজ থাকে না, হইয়া যায় ধর্মব্যবসা। রুজি-রোজগারের ব্যাপারে ধর্মব্যবসা ব্যতীত বিকল্প যে কোনো উত্তম ব্যবস্থা থাকিতে পারে ইহা তো আমাকে শেখানো হয় নাই। কোনো ওস্তাদই (!) আমাদিগকে ইহা ভুলক্রমেও শিখান নাই যে ধর্মের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য শুধুমাত্র মানব কল্যাণ। তিনি স্বপ্ন দেখাইয়াছেন মসজিদের ইমাম হইয়া, নামায পড়াইয়া, মিলাদ পড়াইয়া, জানাজা পড়াইয়া, ধর্মের কাজ করিয়া কীভাবে সংসার চালাইতে হয়। কী করিয়া ওয়াজ করিলে হাজরো মানুষের চোখ ভিজিয়া যায় আর পকেট উজার করিয়া তাহারা অর্থ প্রদান করে তাহা অতি উত্তমরূপে শিখিয়াছি। এখন আপনরাই বলুন, ধর্মের বিনিময়ে আমি টাকা লইব না- তো করিবটা কী? আজিকার দিনে শিক্ষা, চিকিৎসা, শাসন, ধর্ম ইত্যাদি কোনো বিষয়ই আর সেবা বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে না। আর যেথায় নিঃস্বার্থ সেবা পেশায় পরিণত হয় সেথায় আমি মানুষ হইব কেন? আমি শান্তির আশা করিব কেন? আমার কথা তো অনেক শুনাইলাম। শেষ করিবার. পূর্বে সক্রেটিসের একটি বানী শুনাইব। তিনি একদা বলিয়াছিলেন, ‘অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা অর্জনের চাইতে অশিক্ষিত. থাকাই উত্তম’।
কসম স্রষ্টার! কঠিন হিসেব তোমাদিগের দিতে হইবে, যে হিসেব দিতে হইবে না একজন বর্গাচাষী কৃষকের, কুলিমজুরের বা ওই দিনমজুরের।

লেখক
ইলিয়াস আহমেদ